Indira Gandhi First Prime Minister of India: ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত থাকে যখন একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয় কেবল একজন নেতার অদম্য জেদ আর সাহসের ওপর ভিত্তি করে। ১৯৭১ সাল। দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধের দামামা বাজছে।
একদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলছে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা, আর অন্যদিকে ভারত এক কোটি শরণার্থীর বোঝা নিয়ে এক চরম সংকটের মুখে। ঠিক সেই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভারতের বিরুদ্ধে এক কুৎসিত কূটনৈতিক খেলায় মেতেছিলেন।
কিন্তু তাঁরা হয়তো জানতেন না, তাঁদের সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি কোনো সাধারণ রাজনীতিবিদ নন—তিনি ভারতের ‘আয়রন লেডি’ ইন্দিরা গান্ধী (First Prime Minister of India)। কীভাবে তিনি আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করেছিলেন এবং হোয়াইট হাউসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন, সেই গল্পটি যেকোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর।
নিক্সনের অপমান ও ইন্দিরার নীরব উত্তর
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাস। যুদ্ধের ঠিক এক মাস আগে ইন্দিরা গান্ধী ওয়াশিংটন সফরে যান। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বনেতাদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা এবং পাকিস্তানকে নিরস্ত করা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ছিলেন কট্টর ভারত-বিরোধী এবং পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া খানের বন্ধু।
হোয়াইট হাউসে নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে অপমান করার কোনো সুযোগ ছাড়েননি। তিনি ইন্দিরাকে দীর্ঘ ৪৫ মিনিট বসিয়ে রেখেছিলেন, যা ছিল একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য চরম অবমাননাকর। কিন্তু ইন্দিরা ছিলেন ধীরস্থির। তিনি সেই অপমান সহ্য করেছিলেন কেবল একটি মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায়।
যখন তাঁদের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়, নিক্সন অত্যন্ত রুক্ষ ভাষায় ভারতকে সতর্ক করেন যেন তারা পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ না করে। ইন্দিরা গান্ধী শান্ত গলায় নিক্সনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— “ভারত জানে তার জাতীয় স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করতে হয়। আমাদের অন্য কারো উপদেশের প্রয়োজন নেই।”
আরও পড়ুন: ইতিহাস গড়ল ভারত! এবার ব্রিটিশ পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেবেন ভারতীয় বায়ুসেনার ৩ নারী পাইলট
হেনরি কিসিঞ্জারের সেই বিতর্কিত মন্তব্য
পরবর্তীকালে ডিক্লাসিফাইড হওয়া ফাইল থেকে জানা যায়, ইন্দিরা গান্ধীর সেই দৃঢ়তায় নিক্সন এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তিনি এবং কিসিঞ্জার ব্যক্তিগত কথোপকথনে ইন্দিরাকে অত্যন্ত কুরুচিকর ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।
কিসিঞ্জার ইন্দিরাকে “Witch” (ডাইনী) বলেও সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের এই হীনম্মন্যতাকে পাত্তাই দেননি। তিনি ওয়াশিংটন ছাড়ার আগেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ‘ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি’ সই করে নিক্সনের কূটনৈতিক চালে বড়সড় ধাক্কা দেন।
সপ্তম নৌবহর: যখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধের হুমকি দিল
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী আর মুক্তি বাহিনীর দাপটে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনারা কোণঠাসা। ঠিক সেই সময় পাকিস্তানকে রক্ষা করতে এবং ভারতকে ভয় দেখাতে রিচার্ড নিক্সন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার শক্তিশালী ‘সপ্তম নৌবহর’ (7th Fleet) পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর নেতৃত্বে ছিল পরমাণু শক্তিধর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’ (USS Enterprise)।
সারা বিশ্ব তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—ভারত কি পিছু হটবে? আমেরিকার মতো সুপারপাওয়ারের সাথে সরাসরি যুদ্ধ মানেই তো ধ্বংস। রাশিয়ার তৎকালীন গোয়েন্দারা ভারতকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন— “কাজটি শেষ করুন, আমরা কারও ভয়ে আমাদের পরিকল্পনা বদলাব না।”
সেই ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয়
নিক্সন ভেবেছিলেন সপ্তম নৌবহরের খবর শুনেই ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi) ছিলেন অটল। তিনি কেবল সপ্তম নৌবহরকে উপেক্ষা করেননি, বরং সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাল্টা অনুরোধ জানান তাদের নৌবাহিনী পাঠাতে।
ফলস্বরূপ, আমেরিকান নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সোভিয়েত সাবমেরিন আর যুদ্ধজাহাজ তাদের গতিরোধ করে দাঁড়ায়। আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ হয়। তারা বুঝতে পারে, ইন্দিরা গান্ধীকে ভয় দেখানো অসম্ভব।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। আমেরিকার সমস্ত চক্রান্ত ধুলোয় মিশিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন দেশ— বাংলাদেশ। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয়, যার নেপথ্যে ছিলেন এক নিঃসঙ্গ নারী যোদ্ধা।
ইন্দিরা বনাম নিক্সন: শক্তির লড়াই এক নজরে

কেন এই জয় আজও আমাদের গর্বিত করে?
ইন্দিরা গান্ধীর (Indira Gandhi First Prime Minister of India) এই জয় কেবল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় ছিল না, এটি ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা আর সুপারপাওয়ারের ‘বুলিং’-এর বিরুদ্ধে এক বিশাল প্রতিবাদ।
- সার্বভৌমত্বের মর্যাদা: তিনি শিখিয়েছিলেন ভারত কারও আজ্ঞাবহ দেশ নয়।
- কৌশলী নেতৃত্ব: আবেগ দিয়ে নয়, বরং নিখুঁত রণকৌশল আর কূটনৈতিক চালে তিনি আমেরিকাকে কোণঠাসা করেছিলেন।
- নারী শক্তির প্রতীক: বিশ্ব রাজনীতিতে যখন কেবল পুরুষদের আধিপত্য, তখন একজন নারী হয়ে তিনি যেভাবে দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধানকে (নিক্সন ও ইয়াহিয়া) নাস্তানাবুদ করেছিলেন, তা আজও ইতিহাস হয়ে আছে।
আরও পড়ুন: চাঁদের বুকে পা প্রথম নারী মহাকাশচারীর! প্রায় ৫০ বছর পর ইতিহাস গড়তে চলেছেন অদম্য ক্রিস্টিনা কোচ
ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১-এর কূটনীতি সম্পর্কে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about Indira Gandhi First Prime Minister of India)
১. ১৯৭১-এর যুদ্ধে আমেরিকা কেন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল?
উত্তর: মূলত কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার মিত্র। এছাড়া চীন-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইয়াহিয়া খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, তাই নিক্সন পাকিস্তানকে চটাতে চাননি।
২. সপ্তম নৌবহর বা 7th Fleet আসলে কী?
উত্তর: এটি মার্কিন নৌবাহিনীর একটি শক্তিশালী বিভাগ। ১৯৭১-এ ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে নিক্সন এই বহরের পরমাণু চালিত জাহাজ ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’ পাঠিয়েছিলেন।
৩. নিক্সনের অপমানের পর ইন্দিরার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
উত্তর: ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত মার্জিত কিন্তু কঠোর ছিলেন। তিনি হোয়াইট হাউসে তাঁর ভাষণে আমেরিকার নাম না করে তাদের দ্বিচারিতার সমালোচনা করেছিলেন এবং ভারতকে রক্ষা করার অধিকারের কথা বলেছিলেন।
৪. ‘ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
উত্তর: এই চুক্তির ফলে আমেরিকা বা চীন সরাসরি ভারতকে আক্রমণ করতে ভয় পেয়েছিল, কারণ ভারতকে আক্রমণ করার অর্থ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সরাসরি যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানানো।
৫. এই জয়ের পর ইন্দিরা গান্ধীর উপাধি কী হয়েছিল?
উত্তর: এই অভাবনীয় বিজয়ের পর ভারতের তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী তাঁকে ‘দুর্গা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।




Leave a Comment