History of Dum Biryani: বিরিয়ানি কেবল একটি খাবার নয়, এটি একটি আবেগ। আর সেই বিরিয়ানি যদি হয় ‘দম’ পদ্ধতিতে রান্না করা, তবে তার স্বাদ ও সুগন্ধ যেন অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। লখনউ বা আওয়াধি ঘরানার এই রান্নার স্বাদ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে এই রাজকীয় খাবারের পেছনের ইতিহাসটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই বিস্ময়কর।
দম বিরিয়ানির জন্মকথা: নবাব আসিফ-উদ-দৌলার সেই বিশেষ উদ্যোগ
দম বিরিয়ানির ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮শ শতাব্দীতে, নবাব আসিফ-উদ-দৌলার আমলে। ১৭৮৪ সালে আওয়াধ (বর্তমান লখনউ) অঞ্চলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রজাদের মুখে অন্ন তুলে দিতে এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের জন্য নবাব ‘ইমামবাড়া’ তৈরির কাজ শুরু করেন।
শোনা যায়, হাজার হাজার শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন রান্না করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। তখন নবাব এক অভিনব বুদ্ধি বের করলেন। বড় বড় হাঁড়িতে চাল, মাংস, ঘি এবং অল্প মশলা দিয়ে মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো, যাতে সেই বাষ্প বা ‘দমে’ খাবারটি দীর্ঘক্ষণ ধরে সেদ্ধ হয়।
এই পদ্ধতিতে অল্প খরচে অনেক মানুষের জন্য সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা সহজ ছিল। একদিন সেই রান্নার সুগন্ধ নবাবের নাকে পৌঁছালে তিনি তা চেখে দেখেন এবং এতটাই মুগ্ধ হন যে, পরে তাঁর রাজকীয় রান্নাঘরে এই ‘দম’ পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবেই সাধারণ মানুষের খাবার হয়ে ওঠে নবাবদের বিলাসিতা।
কী এই ‘দম’ পদ্ধতি? (The Art of Dum Pukht)
‘দম’ (Dum) কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শ্বাস নেওয়া’ এবং ‘পুক্ত’ (Pukht) মানে হলো ‘রান্না করা’। অর্থাৎ, নিজের বাষ্পে নিজেই রান্না হওয়া।
- প্রক্রিয়া: একটি মাটির বা তামার হাঁড়িতে বিরিয়ানির উপকরণগুলো সাজিয়ে আটা বা ময়দার মণ্ড দিয়ে হাঁড়ির মুখটি বায়ুশূন্য (Airtight) করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
- বৈশিষ্ট্য: খুব ধিমে আঁচে (Slow cooking) দীর্ঘক্ষণ ধরে এই রান্না চলে। এর ফলে মাংসের রস এবং মশলার সুগন্ধ চালের প্রতিটি দানায় মিশে যায়, যা সাধারণ বিরিয়ানিতে পাওয়া অসম্ভব।
লখনউ থেকে হায়দ্রাবাদ: বিরিয়ানির বিবর্তন

দম বিরিয়ানির মূল উৎপত্তি লখনউতে হলেও, সময়ের সাথে সাথে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এর স্বাদে পরিবর্তন এসেছে:
- আওয়াধি বা লখনউই বিরিয়ানি: এটি খুব সুগন্ধি এবং মশলায় মৃদু হয়। এখানে মাংস ও চাল আলাদা সেদ্ধ করে দমে বসানো হয়।
- হায়দ্রাবাদি দম বিরিয়ানি: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযানের সময় এই ঘরানার জন্ম। এটি লখনউই বিরিয়ানির তুলনায় অনেক বেশি ঝাল এবং মশলাদার। এখানে কাঁচা মাংসের সাথে চাল দমে দেওয়া হয় (কচ্চি বিরিয়ানি)।
কেন আজও দম বিরিয়ানি অপ্রতিদ্বন্দ্বী?
অন্যান্য রান্নার পদ্ধতিতে মশলার আর্দ্রতা এবং সুগন্ধ উবে যাওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু ‘দম পুক্ত’ পদ্ধতিতে পুষ্টিগুণ এবং ঘ্রাণ পুরোটাই ভেতরে সংরক্ষিত থাকে। এটিই এই বিরিয়ানিকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খাবারের মর্যাদা দিয়েছে।
উপসংহার: আজকের আধুনিক কিচেনেও মাটির হাঁড়ির সেই পুরোনো দম বিরিয়ানির স্বাদ আজও অতুলনীয়। কোনো এক দুর্ভিক্ষের দিনে সাধারণ শ্রমিকের ক্ষুধা মেটাতে যে খাবারের জন্ম হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘রয়েল কুইজিন’। এক প্লেট বিরিয়ানির প্রতিটি গ্রাসে মিশে আছে শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
১. দম বিরিয়ানির জনক কে?
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, নবাব আসিফ-উদ-দৌলার আমলেই বর্তমানের জনপ্রিয় দম বিরিয়ানি বা দম পুক্ত রান্নার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। লোককথা অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় প্রজাদের সস্তায় পুষ্টিকর খাবার জোগাতে নবাব এই ‘দম’ পদ্ধতিতে বিশাল হাঁড়িতে রান্না করার আদেশ দিয়েছিলেন।
২. বিরিয়ানি ও পোলাওয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?
পোলাও রান্নার সময় মাংস ও চাল একসাথে কষানো হয়। কিন্তু বিরিয়ানিতে (বিশেষ করে দম বিরিয়ানিতে) চাল ও মাংস আলাদাভাবে আধা-সেদ্ধ করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে দমে দেওয়া হয়। এছাড়া পোলাও সাধারণত বিরিয়ানির তুলনায় কম মশলাদার হয় এবং এতে বিরিয়ানির মতো তীব্র সুগন্ধি ও রঙের আধিক্য থাকে না।
৩. ‘দম’ দিতে কতক্ষণ সময় লাগে?
পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত ধিমে আঁচে দমে রাখা হয়। রান্নার পাত্রের মুখ আটা দিয়ে এমনভাবে বন্ধ করা হয় যাতে ভেতরের বাষ্প বা ‘দম’ বাইরে বেরোতে না পারে এবং নিজস্ব আর্দ্রতায় মাংস তুলতুলে হয়ে যায়।
৪. কলকাতায় কি দম বিরিয়ানি পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, তবে কলকাতার বিরিয়ানিতে লখনউই প্রভাব থাকলেও এতে আলুর সংযোজন এটিকে এক অনন্য বিশেষত্ব দিয়েছে। নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর হাত ধরেই লখনউ থেকে এই রান্নার শিল্প কলকাতায় আসে, যা পরবর্তীতে বাঙালির রুচি অনুযায়ী বিবর্তিত হয়েছে।




Leave a Comment