How to Make Pressure Cooker Cake Recipe: ছোটবেলার ছুটির দিনগুলোর কথা একবার মনে করে দেখুন তো! তখন তো আর সবার বাড়িতে মাইক্রোওয়েভ বা দামি ইলেকট্রিক ওভেন ছিল না। কিন্তু তাই বলে কি আমাদের কেক খাওয়া আটকে ছিল? একদমই না। আমাদের মা বা কাকিমারা ভারী অ্যালুমিনিয়ামের প্রেসার কুকারেই অসাধারণ সব কেক বানিয়ে ফেলতেন। কুকারের ঢাকনা খুলতেই পুরো বাড়ি ভ্যানিলা আর গরম কেকের মিষ্টি গন্ধে ভরে উঠত।
আজকাল আমাদের জীবন অনেক আধুনিক হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক সময় হঠাৎ করে বাচ্চার জন্মদিনে বা ছুটির বিকেলে নিজের হাতে একটা কেক বানাতে ইচ্ছে করে। তখন যদি বাড়িতে ওভেন না থাকে, মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু মন খারাপের একদম কোনো কারণ নেই!
আপনার রান্নাঘরে থাকা সাধারণ প্রেসার কুকারটিই কিন্তু একটি আস্ত ওভেনের কাজ করতে পারে। শুধু আপনাকে সঠিক নিয়ম এবং কিছু ছোট ছোট টিপস জানতে হবে। আজ আমরা একদম পুরোনো দিনের সেই জাদুকরী পদ্ধতিতে প্রেসার কুকারে নরম আর তুলতুলে স্পঞ্জ কেক বানানোর গল্প করব। চলুন, আজ আবার আমাদের রান্নাঘরকে সেই ছোটবেলার মিষ্টি গন্ধে ভরিয়ে তুলি!
ওভেন ছাড়াই কেক – মা-কাকিমাদের এটাই ছিল আসল ম্যাজিক!
প্রেসার কুকারে কেক বানানোটা শুনতে খুব কঠিন মনে হলেও, আসলে এটি ভীষণ সোজা একটি কাজ। ওভেনে যেমন চারদিক থেকে সমানভাবে তাপ লাগে, কুকারের ভেতরেও আমরা ঠিক সেই একই পরিবেশ তৈরি করতে পারি।
এর জন্য আমাদের কুকারের ভেতরে বালি বা লবণ ব্যবহার করতে হবে। এই লবণ বা বালি তাপ ধরে রাখে এবং কুকারের ভেতরের তাপমাত্রাকে একদম ওভেনের মতো গরম করে তোলে। এর ফলে কেকটি নিচ থেকে পুড়ে যায় না, বরং চারদিক থেকে সমানভাবে ফুলে ওঠে। এটি আমাদের মা-দিদিমাদের এক অসাধারণ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ‘দেশি জুগাড়’ বা আবিষ্কার। এই পদ্ধতিতে বানানো কেক অনেক সময় বেকারির কেনা কেকের চেয়েও অনেক বেশি নরম এবং সুস্বাদু হয়।
কুকারে কেক বানাতে কী কী লাগবে? রান্নাঘরের সাধারণ জিনিসই যথেষ্ট! How to Make Pressure Cooker Cake Recipe
এই কেক বানানোর জন্য আপনাকে বাজার থেকে খুব দামি কোনো জিনিস কিনে আনতে হবে না। ঘরে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়েই এই জাদুকরী কেক তৈরি করা যায়। চলুন দেখে নিই কী কী লাগবে:
- ময়দা: দেড় কাপ (অবশ্যই ভালো করে চেলে নেওয়া)।
- চিনি: ১ কাপ (মিক্সিতে গুঁড়ো করে নেওয়া, যাতে সহজে গলে যায়)।
- ডিম: ৩টি (ফ্রিজে থাকলে অন্তত এক ঘণ্টা আগে বের করে রাখবেন)।
- সাদা তেল বা গলানো মাখন: আধা কাপ (তেল ব্যবহার করলে কেক বেশি নরম হয়)।
- বেকিং পাউডার: ১ চা চামচ।
- বেকিং সোডা: আধা চা চামচ (এটি কেককে স্পঞ্জি করতে সাহায্য করে)।
- ভ্যানিলা এসেন্স: ১ চা চামচ (ডিমের গন্ধ দূর করতে)।
- তরল দুধ: আধা কাপ (প্রয়োজনমতো)।
- লবণ: কুকারের নিচে বিছানোর জন্য ২ কাপ সাধারণ লবণ।
(আপনার যদি ডিম খেতে অপছন্দ হয়, তবে ডিমের বদলে আধা কাপ টক দই ব্যবহার করতে পারেন। স্বাদ একদম একই রকম দারুণ হবে!)

কুকারে কেক বানানোর সহজ পদ্ধতি
প্রথমে কুকারটাকে ওভেনের মতো তৈরি করে নিই
কেকের ব্যাটার তৈরির আগে আমাদের কুকারটাকে প্রস্তুত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এটিই হলো প্রেসার কুকার কেকের সবচেয়ে বড় এবং গোপন রহস্য।
প্রথমে আপনার রান্নাঘরের সবচেয়ে ভারী তলাওয়ালা প্রেসার কুকারটি বেছে নিন। এবার কুকারের ঢাকনা থেকে রবারের রিং (গ্যাসকেট) এবং ওপরের সিটি (ওয়েট বা হুইসেল) একদম খুলে আলাদা করে রাখুন। কেক বানানোর সময় এই দুটি জিনিসের কোনো প্রয়োজন নেই, বরং এগুলো রাখা বিপজ্জনক হতে পারে।
এবার কুকারের ভেতরে ২ কাপ সাধারণ লবণ বা পরিষ্কার বালি সমানভাবে বিছিয়ে দিন। এই লবণের ঠিক মাঝখানে একটি স্টিলের স্ট্যান্ড বা ছোট বাটি উপুড় করে বসিয়ে দিন। এবার কুকারের ঢাকনা আটকে দিন (সিটি এবং রিং ছাড়া)। গ্যাসের আঁচ একদম মাঝারি করে কুকারটিকে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য গরম হতে দিন। এই সময়টায় কুকারটি ভেতরে ভেতরে একদম একটি প্রি-হিটেড (Pre-heated) ওভেনের মতো তৈরি হয়ে যাবে।
এবার ব্যাটার তৈরির পালা
কুকার গরম হতে হতে চলুন আমরা কেকের ব্যাটারটা তৈরি করে নিই। একটি বড় বাটিতে প্রথমে ডিমগুলো ভেঙে নিন। এর মধ্যে গুঁড়ো করা চিনি দিয়ে খুব ভালো করে ফেটাতে থাকুন। আপনার কাছে ইলেকট্রিক বিটার না থাকলে সাধারণ কাঁটা চামচ বা হ্যান্ড হুইস্ক দিয়ে ৫-৭ মিনিট একটানা ফেটান। দেখবেন মিশ্রণটি একদম সাদা এবং ফেনার মতো হয়ে গেছে।
এবার এর মধ্যে সাদা তেল বা মাখন এবং ভ্যানিলা এসেন্স দিয়ে আলতো করে মিশিয়ে নিন। এরপর একটি চালুনিতে ময়দা, বেকিং পাউডার এবং বেকিং সোডা একসাথে নিয়ে ডিমের মিশ্রণের ওপরে চেলে দিন। ময়দা চাললে কেকের ভেতরে বাতাস ঢোকে এবং কেক খুব ভালো ফোলে।
সবশেষে স্প্যাচুলা বা চামচ দিয়ে মিশ্রণটি খুব আলতো হাতে ঘোরাতে থাকুন। একে বলা হয় ‘কাট অ্যান্ড ফোল্ড’ পদ্ধতি। খুব বেশি জোরে বা তাড়াহুড়ো করে ঘাটবেন না। ব্যাটার যদি খুব ঘন মনে হয়, তবে অল্প অল্প করে দুধ মেশান। ব্যাটারটি খুব বেশি পাতলা বা খুব বেশি ঘন হবে না। ঠিক ওপর থেকে ফেললে যেন ফিতের মতো ভাঁজ হয়ে পড়ে, এমন হতে হবে।
কুকারের ভেতরে কেকের বাটি
আপনার কাছে যদি কেক বানানোর অ্যালুমিনিয়ামের মোল্ড বা বাটি থাকে, তবে খুব ভালো। না থাকলে রান্নাঘরের যেকোনো চওড়া টিফিন বক্স বা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিতে পারেন। বাটির ভেতরে একটু তেল মাখিয়ে নিন এবং একটু ময়দা ছড়িয়ে দিন। এতে কেকটি বাটির নিচে লেগে যাবে না।
এবার তৈরি করা ব্যাটারটি বাটিতে ঢেলে দিন। বাটিটি হাত দিয়ে দু-একবার হালকা করে ঠুকে দিন, যাতে ভেতরের জমে থাকা বাতাস বা এয়ার বাবলস বেরিয়ে যায়।
সাবধানে কুকারের ঢাকনা খুলুন (কুকার কিন্তু এখন ভীষণ গরম!)। ভেতরে থাকা স্ট্যান্ডের ওপর কেকের বাটিটি খুব সাবধানে বসিয়ে দিন। বাটি যেন কুকারের দেয়াল স্পর্শ না করে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এবার ঢাকনা বন্ধ করে দিন। গ্যাসের আঁচ একদম কমিয়ে দিন (Low flame)। এই অবস্থায় ঘড়ি ধরে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই অপেক্ষার সময়টাই হলো সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার!
কুকারে কেক বানানোর সময় যে ভুলগুলো একদম করবেন না!
আমাদের অনেকেই কেক বানাতে গিয়ে কিছু ছোট ভুল করে ফেলি, যার ফলে কেক চুপসে যায় বা শক্ত হয়ে যায়। একটু খেয়াল রাখলেই এই সমস্যাগুলো এড়ানো সম্ভব:
- বারবার ঢাকনা খুলবেন না: কেক বেক হওয়ার সময় বারবার কুকারের ঢাকনা খুলে দেখবেন না। এতে ভেতরের গরম বাতাস বেরিয়ে যায় এবং ফুলে ওঠা কেক মাঝখান থেকে চুপসে যায়। অন্তত ৩৫ মিনিট পার হওয়ার আগে ঢাকনা একদম খুলবেন না।
- কুকারে জল দেবেন না: অনেকেই ভুল করে লবণের বদলে কুকারের নিচে জল দিয়ে দেন। এটি একদম করবেন না! জল দিলে কেক বেক হবে না, বরং ভাপে সেদ্ধ হয়ে যাবে।
- সবকিছু ঘরের তাপমাত্রায় রাখবেন: ফ্রিজ থেকে সরাসরি বের করা ঠান্ডা ডিম বা দুধ ব্যবহার করবেন না। সবকিছু যেন রুম টেম্পারেচার বা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকে।
- টুথপিক টেস্ট: ৪০ মিনিট পর ঢাকনা খুলে কেকের ঠিক মাঝখানে একটি পরিষ্কার টুথপিক বা ছুরি ঢুকিয়ে দেখুন। যদি ছুরিটি একদম পরিষ্কার বেরিয়ে আসে, তার মানে আপনার কেক পুরোপুরি তৈরি! যদি ব্যাটার লেগে থাকে, তবে আরও ৫ মিনিট বেক হতে দিন।
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক অদ্ভুত আনন্দ
কেক তৈরি হয়ে গেলে গ্যাস বন্ধ করে দিন। কুকার থেকে বাটিটি বের করে পুরোপুরি ঠান্ডা হতে দিন। গরম অবস্থায় কেক বের করতে গেলে তা ভেঙে যেতে পারে। ঠান্ডা হওয়ার পর ছুরির সাহায্যে বাটির চারপাশটা একটু ছাড়িয়ে নিন। এবার একটি প্লেটে বাটিটি উল্টে দিলেই দেখবেন কত সুন্দরভাবে স্পঞ্জ কেক বেরিয়ে এসেছে!
নিজের হাতে বানানো এই কেক যখন আপনি আপনার সন্তান বা পরিবারের মানুষদের কেটে খাওয়াবেন, তখন তাদের মুখের হাসিটা আপনার সব পরিশ্রম ভুলিয়ে দেবে। ওভেন নেই বলে নিজেকে আর পিছিয়ে রাখবেন না। মায়ের শেখানো এই পুরোনো পদ্ধতিতেই লুকিয়ে আছে আসল ভালোবাসা এবং পারফেকশন। আজই রান্নাঘরে যান এবং নিজের জাদুকরী হাতে তৈরি করুন এই অসাধারণ নরম স্পঞ্জ কেক!
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs)
১. কুকারের ঢাকনার রিং (গ্যাসকেট) এবং সিটি (হুইসেল) খুলে রাখা কেন এত জরুরি? রিং এবং সিটি লাগানো থাকলে কুকারের ভেতরে মারাত্মক চাপ বা প্রেসার তৈরি হবে। যেহেতু ভেতরে কোনো জল নেই, তাই অতিরিক্ত চাপে কুকার ফেটে গিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তার জন্য এই দুটি খুলে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
২. আমি কি ডিম ছাড়া (Eggless) এই কেকটি বানাতে পারব? হ্যাঁ, অবশ্যই পারবেন। ৩টি ডিমের বদলে আপনি আধা কাপ তাজা এবং জল ঝরানো টক দই ব্যবহার করতে পারেন। দই দিলে কেক অত্যন্ত নরম এবং স্পঞ্জি হয়।
৩. একবার ব্যবহার করা লবণ কি পরে আবার কেক বানাতে ব্যবহার করা যাবে? একদম যাবে! কেক বানানো শেষ হলে লবণটা ঠান্ডা করে একটি কাঁচের বা প্লাস্টিকের কৌটোয় ভরে রেখে দিন। পরের বার কেক বা বিস্কুট বেক করার সময় এই একই লবণ আপনি বারবার ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এই লবণ রান্নায় ব্যবহার করবেন না।
৪. কেক বেক করার জন্য লবণের বদলে আর কী ব্যবহার করা যায়? আপনার হাতের কাছে যদি অতিরিক্ত লবণ না থাকে, তবে আপনি পরিষ্কার এবং শুকনো বালি (Sand) ব্যবহার করতে পারেন। বালির তাপ ধারণ করার ক্ষমতাও লবণের মতোই খুব ভালো।
৫. আমার কেক বারবার মাঝখান থেকে দেবে বা চুপসে যায় কেন? এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো বেক হওয়ার সময় বারবার কুকারের ঢাকনা খুলে দেখা। এছাড়া যদি বেকিং পাউডার খুব পুরোনো হয়ে যায় বা ব্যাটার খুব বেশি জোরে ফেটানো হয়, তাহলেও কেক মাঝখান থেকে দেবে যেতে পারে।




Leave a Comment