Durba Banerjee First Female Commercial Pilot: একটু চোখ বন্ধ করে ১৯৫০-এর দশকের কথা ভাবুন তো! আমাদের দেশ তখন সবে স্বাধীন হয়েছে। সমাজ ব্যবস্থা ছিল ভীষণ রক্ষণশীল। মেয়েরা একটু বেশি পড়াশোনা করলেই সমাজের মানুষ চোখ রাঙাত। মেয়েদের আসল কাজ মানেই ছিল রান্নাঘর সামলানো আর সংসার করা।
সেই সময় দাঁড়িয়ে যদি কোনো মেয়ে বলত, “আমি আকাশে এরোপ্লেন চালাব!”, তবে তাকে হয়তো পাগল বলে হাসাহাসি করা হতো। কিন্তু সেই হাসাহাসি আর চোখ রাঙানিকে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন একজন সাধারণ বাঙালি মেয়ে। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন ভারতের এভিয়েশন বা বিমান চলাচলের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—দুর্বা ব্যানার্জি।
তিনি শুধু আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নই দেখেননি, তিনি সেই স্বপ্নকে নিজের হাতে ছিনিয়ে এনেছিলেন। আজ আমরা জানব, সমাজের সমস্ত বাধা পেরিয়ে কীভাবে তিনি ভারতের প্রথম নারী কমার্শিয়াল পাইলট বা Durba Banerjee First Female Commercial Pilot হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। চলুন, সেই রোমাঞ্চকর গল্পটা শুনি।
পাইলট হওয়ার পথে সমাজের সেই কঠিন বাধাগুলো কীভাবে পেরোলেন দুর্বা?
ছোটবেলা থেকেই দুর্বা ব্যানার্জির স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। তিনি পাইলট হওয়ার জন্য সমস্ত ট্রেনিং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে শেষ করেছিলেন। এরপর তিনি যখন চাকরি খুঁজতে যান, তখন শুরু হয় আসল সংগ্রাম।
সেই যুগে মেয়েদের পাইলট হিসেবে মেনে নিতে কেউই রাজি ছিল না। চারিদিক থেকে তাঁকে বলা হতো, মেয়েদের জন্য পাইলটের বদলে এয়ার হোস্টেস (Air Hostess) বা বিমানবালার কাজই বেশি মানানসই। ভাবুন তো, একজন মেয়ের কাছে এই কথাটা কতটা অপমানের! যে মেয়েটা দিনরাত এক করে পাইলট হওয়ার কঠিন ট্রেনিং পাস করেছে, তাকে বলা হচ্ছে চা-কফি পরিবেশন করার কাজ নিতে! কিন্তু দুর্বা এই অপমানে ভেঙে পড়েননি, বরং তাঁর জেদ আরও হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
হার না মানা লড়াই: অবশেষে যেদিন আকাশে উড়ল তাঁর স্বপ্নের উড়ান!
পাইলটের চাকরি না পেয়ে দুর্বা প্রথমদিকে এয়ার সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-তে একটি ছোট কাজ নেন। সেখানে তাঁর কাজ ছিল সার্ভের জন্য ছোট ছোট প্লেন ওড়ানো। কিন্তু তাঁর পাখির চোখ ছিল বিশাল বড় যাত্রীবাহী কমার্শিয়াল প্লেনের দিকে।
তিনি বারবার ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে (Indian Airlines) আবেদন করতে থাকেন। তাঁর মেধা, তাঁর যোগ্যতা এবং তাঁর অদম্য জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ১৯৬৬ সালে তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে যোগ দেন। আর এর মাধ্যমেই তৈরি হয় এক নতুন ইতিহাস! ভারতের আকাশ পায় তার প্রথম নারী পাইলট। Durba Banerjee First Female Commercial Pilot হিসেবে সেদিন প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, মেধা আর জেদ থাকলে লিঙ্গবৈষম্য কোনো বাধাই নয়।

১৮,৫০০ ঘণ্টার উড়ান: আকাশে রাজত্ব করলেন এক বাঙালি নারী!
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে যোগ দেওয়ার পর দুর্বা ব্যানার্জিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি ফকার ফ্রেন্ডশিপ (F27) থেকে শুরু করে বোয়িং ৭৩৭ (Boeing 737)-এর মতো বড় এবং জটিল যাত্রীবাহী বিমান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উড়িয়েছেন।
তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে তিনি আকাশে মোট ১৮,৫০০ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়ান সম্পন্ন করেছিলেন! এই পরিসংখ্যান যেকোনো পুরুষ পাইলটের জন্যও রীতিমতো ঈর্ষণীয়। একজন নারী হিসেবে তিনি যেভাবে দিনের পর দিন ঝড়-বৃষ্টি আর খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে যাত্রীদের নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছেন, তা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আজকের নারী পাইলটদের পথপ্রদর্শক তিনি!
আজ যখন আমরা বিমানবন্দরে গিয়ে কোনো মহিলা পাইলটকে প্লেন ওড়াতে দেখি, তখন আমাদের বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে। আজ ভারত এমন একটি দেশ, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শতাংশ মহিলা পাইলট রয়েছেন।
কিন্তু এই বিশাল বড় পরিবর্তনের বীজটা বপন করেছিলেন ওই একজন বাঙালি মেয়ে। দুর্বা ব্যানার্জি যদি সেদিন সমাজের কটাক্ষে ভয় পেয়ে এয়ার হোস্টেস হয়ে যেতেন, তাহলে হয়তো ভারতের মেয়েদের কমার্শিয়াল পাইলট হওয়ার স্বপ্নটা আরও অনেক বছর পিছিয়ে যেত।
তিনি শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেননি, তিনি দেশের লাখ লাখ মেয়ের জন্য আকাশটাকে চিরকালের মতো খুলে দিয়ে গেছেন। তাঁর এই অদম্য লড়াই আমাদের শেখায় যে, সমাজ যদি আপনার স্বপ্নের পথে দেওয়াল তুলে দেয়, তবে সেই দেওয়াল ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা আপনাকেই নিতে হবে।
ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট ভাবনা কান্থ: বিহারের সাধারণ মেয়ের আকাশ ছোঁয়ার অবিশ্বাস্য গল্প
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about Durba Banerjee First Female Commercial Pilot)
১. ভারতের প্রথম মহিলা কমার্শিয়াল পাইলট কে?
বাঙালি মেয়ে দুর্বা ব্যানার্জি (Durba Banerjee) হলেন ভারতের প্রথম মহিলা কমার্শিয়াল পাইলট, যিনি ১৯৫০-এর দশকের রক্ষণশীল সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ইতিহাস গড়েছিলেন।
২. Durba Banerjee First Female Commercial Pilot হিসেবে কবে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে যোগ দেন?
দীর্ঘ লড়াই এবং জেদের পর ১৯৬৬ সালে তিনি কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে (Indian Airlines) যোগদান করার সুযোগ পান।
৩. চাকরি চাইতে গিয়ে দুর্বা ব্যানার্জিকে কী ধরনের কথা শুনতে হয়েছিল?
তৎকালীন রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে পাইলটের বদলে এয়ার হোস্টেস বা বিমানবালা হওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা দুর্বা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
৪. তাঁর ক্যারিয়ারে দুর্বা ব্যানার্জি মোট কত ঘণ্টা বিমান উড়িয়েছিলেন?
তাঁর দীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি বোয়িং ৭৩৭ সহ বিভিন্ন বড় যাত্রীবাহী বিমানে মোট ১৮,৫০০ ঘণ্টারও বেশি সময় সফল উড়ান সম্পন্ন করেছিলেন।
৫. আজকের মেয়েদের কাছে দুর্বা ব্যানার্জির গল্প কেন এত অনুপ্রেরণার?
কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, পুরুষদের আধিপত্য থাকা কঠিন পেশাতেও নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় রাজত্ব করতে পারে। তাঁর জেদের জন্যই আজ ভারতের অগণিত মেয়ে পাইলট হওয়ার সাহস পায়।




Leave a Comment