Tessy Thomas Missile Woman: টেসি থমাসের জন্ম ১৯৬৩ সালে কেরালার একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং ছিমছাম শহর আলাপুঝায় (Alappuzha)। তাঁর পরিবার ছিল একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। তাঁর বাবা ছিলেন একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং মা ছিলেন গৃহবধূ। তাঁর জন্মের পর বাবা-মা মাদার তেরেসার নাম অনুসারে মেয়ের নাম রেখেছিলেন ‘টেসি’।
তাঁর বাড়ির খুব কাছেই ছিল থুম্বা রকেট লঞ্চিং স্টেশন (Thumba Equatorial Rocket Launching Station)। ছোটবেলায় যখন অন্যান্য ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলাধুলা করত, ছোট্ট টেসি তখন অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। থুম্বা স্টেশন থেকে যখন রকেটগুলো ধোঁয়া উড়িয়ে আকাশের দিকে ছুটে যেত, তখন তাঁর মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল তৈরি হতো। ওই রকেটের আওয়াজ আর ধোঁয়াই তাঁর মনের ভেতর মহাকাশ এবং বিজ্ঞানের বীজ বুনে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট মেয়েটি সেদিনই ঠিক করেছিল, বড় হয়ে সেও আকাশ ছোঁয়ার কোনো কাজ করবে।
পুরুষদের আধিপত্য থাকা জগতে এক নারীর নিঃশব্দ প্রবেশ!
ছোটবেলার স্বপ্নকে সত্যি করতে টেসি খুব মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি কেরালা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। এরপর তিনি পুনের ‘ইনস্টিটিউট অফ আর্মামেন্ট টেকনোলজি’ থেকে গাইডেড মিসাইলের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
লখনউয়ের গলি থেকে চাঁদে পাড়ি: ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ ঋতু কারিধালের সাফল্যের অজানা গল্প
১৯৮৮ সাল। টেসি থমাসের জীবনের সবচেয়ে বড় দিনটি এল। তিনি ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও (DRDO)-তে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেলেন। সেই সময়ে মিসাইল বা প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের দলে কোনো নারী থাকতেন না। এটি ছিল পুরোপুরি পুরুষদের একটি জগত। কিন্তু টেসি কোনো ভয় পাননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি তাঁর আইডল বা স্বপ্নের মানুষ ড. এ.পি.জে আবদুল কালামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কালাম স্যার তাঁর প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি। তিনি টেসিকে অগ্নি মিসাইল প্রজেক্টের (Agni Missile Project) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন।
অগ্নি-৪ এবং অগ্নি-৫: যখন সারা বিশ্ব দেখল এক ভারতীয় নারীর ক্ষমতা!
ডিআরডিও-তে কাজ করার সময় টেসি তাঁর মেধা এবং পরিশ্রম দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে যখন তাঁকে অগ্নি-৪ (Agni-IV) মিসাইলের প্রজেক্ট ডিরেক্টর করা হয়। ভারতের ইতিহাসে এর আগে কোনো নারী কোনো মিসাইল প্রজেক্টের নেতৃত্ব দেননি।
তাঁর নেতৃত্বে অগ্নি-৪ এর সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। কিন্তু আসল ম্যাজিক তো তখনো বাকি ছিল! এরপর তাঁকে অগ্নি-৫ (Agni-V) মিসাইল প্রজেক্টের ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। অগ্নি-৫ হলো ভারতের এমন একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM), যা ৫ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারে। এটি ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য একটি বিশাল বড় ঢাল।
২০১২ সালে যখন টেসি থমাসের নেতৃত্বে অগ্নি-৫ মিসাইলের সফল উৎক্ষেপণ হলো, তখন সারা বিশ্ব ভারতের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বুঝতে পারল যে, ভারতের নারীরাও রকেট আর মিসাইল বানাতে পারে। এই অসামান্য সাফল্যের পরই সংবাদমাধ্যম তাঁকে ভালোবেসে ‘মিসাইল ওম্যান অফ ইন্ডিয়া’ (Missile Woman of India) উপাধি দেয়।

মিসাইল বানানো আর ছেলের অঙ্ক করানো – দুটোই চলত সমান তালে!
অনেকেই মনে করেন, যে নারীরা অফিসে বড় পদে কাজ করেন, তাঁরা হয়তো সংসার বা সন্তানদের ঠিকমতো সময় দিতে পারেন না। কিন্তু টেসি থমাস এই ধারণাকেও একদম ভুল প্রমাণ করেছেন।
তাঁর স্বামীর নাম সরোজ কুমার, যিনি নৌবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন। তাঁদের একটি ছেলেও আছে। টেসি তাঁর কাজের জায়গাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তিনি ভারতের তৈরি লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট ‘তেজাস’-এর (Tejas) নাম অনুসারে নিজের ছেলের নামও রেখেছিলেন ‘তেজাস’।
অফিসে তিনি যেমন একটি ভয়ংকর মিসাইল লঞ্চের কোটি কোটি টাকার হিসাব মেলাতেন, তেমনি বাড়ি ফিরে তিনি সাধারণ মায়ের মতোই ছেলের অঙ্কের হোমওয়ার্ক করাতেন। অনেক দিন এমন হয়েছে যে, সামনে মিসাইল টেস্টের প্রচুর চাপ, আবার অন্যদিকে ছেলেরও পরীক্ষা। তিনি খুব ঠান্ডা মাথায় দুটি কাজই একসাথে নিখুঁতভাবে সামলেছেন। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, পরিবার এবং কাজ—দুটিকেই সমানভাবে ভালোবাসা যায়।
শুধু একটা নাম নয়, তিনি আজ কোটি কোটি মেয়ের সাহস!
টেসি থমাসের এই আকাশছোঁয়া সাফল্য দেশের সমস্ত নারীর জন্য এক বিশাল বড় অনুপ্রেরণা। ডিআরডিও (DRDO)-র মতো একটি প্রতিষ্ঠানে অ্যারোনটিক্যাল সিস্টেমের ডিরেক্টর জেনারেল (Director General of Aeronautical Systems) পদে পৌঁছানো মোটেও সহজ কথা নয়।
বিজ্ঞান এবং প্রতিরক্ষায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী জাতীয় পুরস্কার থেকে শুরু করে আরও অনেক সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো সেই সাহস, যা তিনি দেশের লাখ লাখ মেয়েদের মনে জাগিয়ে তুলেছেন।
তাঁর গল্প আমাদের শেখায় যে, কোনো কাজই কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট করা নেই। মেয়েরা চাইলে কেবল ঘরের রান্নাঘর নয়, দেশের প্রতিরক্ষার মতো কঠিন দায়িত্বও নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারে। পরের বার আকাশে কোনো রকেট বা মিসাইল উড়তে দেখলে, অবশ্যই আমাদের এই গর্বিত ‘মিসাইল ওম্যান’-এর কথা একবার মনে করবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about Tessy Thomas Missile Woman)
১. টেসি থমাস কে?
টেসি থমাস হলেন ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (DRDO) একজন শীর্ষ বিজ্ঞানী, যিনি প্রথম নারী হিসেবে ভারতের মিসাইল প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২. টেসি থমাসকে কেন ভারতের ‘মিসাইল ওম্যান’ বলা হয়?
ভারতের অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অত্যাধুনিক অগ্নি-৪ এবং অগ্নি-৫ (Agni-V) মিসাইল তৈরিতে এবং তার সফল উৎক্ষেপণে অসাধারণ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁকে ভারতের ‘মিসাইল ওম্যান’ বলা হয়।
৩. ছোটবেলায় টেসি থমাস কোথা থেকে বিজ্ঞানী হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন?
তাঁর বাড়ির কাছেই কেরালার থুম্বা রকেট লঞ্চিং স্টেশন ছিল। ছোটবেলায় সেই স্টেশন থেকে রকেট ওড়ার দৃশ্য এবং আওয়াজ দেখেই তিনি মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
৪. টেসি থমাস কার সাথে প্রথম ডিআরডিও-তে কাজ শুরু করেন?
১৯৮৮ সালে ডিআরডিও-তে যোগ দেওয়ার পর তিনি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এ.পি.জে আবদুল কালামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাঁর কাজ শুরু করেছিলেন।
৫. তিনি তাঁর ছেলের নাম ‘তেজাস’ রেখেছিলেন কেন?
কাজের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি ভারতের তৈরি বিখ্যাত ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান ‘তেজাস’-এর (LCA Tejas) নাম অনুসারে নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন।




Leave a Comment