Sucheta Kripalani First Woman Chief Minister: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যখনই কোনো শক্তিশালী নারী নেতৃত্বের কথা ওঠে, সবার আগে মাথায় আসে ইন্দিরা গান্ধীর নাম। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীরও আগে, যখন ভারতীয় সমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল, তখন এক নারী হিমালয়ের মতো দৃঢ়তা নিয়ে উত্তরপ্রদেশের মতো বিশাল রাজ্যের শাসনভার হাতে নিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন—সুচেতা কৃপালানি।
আমরা তাঁকে তাকে ‘ভারতের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে চিনলেও, তাঁর পর্দার ওপারের জীবন ছিল আরও বেশি নাটকীয়, রোমাঞ্চকর এবং ত্যাগে ভরা। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব সুচেতা কৃপালানির জীবনের কিছু ধুলোপড়া অজানা পাতা।
পর্দার আড়ালের এক নির্ভীক বিপ্লবী (The Underground Leader)
অনেকেই জানেন না যে, ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় সুচেতা কৃপালানি শুধুমাত্র একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন না। যখন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে শ্রীঘরে পাঠিয়েছিল, তখন সুচেতা আত্মগোপন বা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন।
তিনি ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াতেন এবং বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন। এমনকি রাম মনোহর লোহিয়া এবং অরুণা আসফ আলির মতো নেতাদের সাথে মিলে তিনি একটি গোপন রেডিও স্টেশনও পরিচালনা করেছিলেন। তার এই সাহসিকতা দেখে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী তাঁকে ‘নির্ভীক সৈনিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
প্রেম ও আদর্শের লড়াই: যখন পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। Sucheta Kripalani First Woman Chief Minister
সুচেতা কৃপালানির ব্যক্তিগত জীবন ছিল সিনেমার গল্পের মতো। তিনি যখন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা, তখন তার পরিচয় হয় বিখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী আচার্য জে. বি. কৃপালানির সাথে। বয়সে ২০ বছরের বড় কৃপালানির প্রেমে পড়েন সুচেতা।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। সুচেতার পরিবার এবং স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন। গান্ধীজির ভয় ছিল যে বিয়ের ফলে সুচেতা হয়তো স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজ থেকে দূরে সরে যাবেন। কিন্তু সুচেতা ছিলেন অটল। তিনি গান্ধীজিকে বলেছিলেন, “আমার প্রেম আমার দেশের প্রতি দায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে দেবে, কমিয়ে দেবে না।” শেষ পর্যন্ত ১৯৩৬ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সারা জীবন একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন।
১৫ই আগস্টের সেই সুরকার কণ্ঠ
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট, মধ্যরাতে যখন জওহরলাল নেহরু তার বিখ্যাত ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’ ভাষণ দিচ্ছেন, তার ঠিক আগেই ভারতের সংসদ ভবন বা কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে এক উদাত্ত কণ্ঠের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। সেই কণ্ঠটি ছিল সুচেতা কৃপালানির।
তিনিই সেই প্রথম নারী, যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’, ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ এবং ‘জন গণ মন’ গেয়েছিলেন। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত, যা আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে এক আপসহীন শাসক
১৯৬৩ সালে যখন তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল এক শ্রমিক ধর্মঘট। প্রায় ৬২ দিন ধরে সেই ধর্মঘট চলেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভেবেছিলেন একজন নারী হয়ে হয়তো তিনি এই পরিস্থিতি সামলাতে পারবেন না।
কিন্তু সুচেতা কৃপালানি প্রমাণ করেছিলেন তিনি কতটা কঠোর হতে পারেন। তিনি কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি এবং প্রশাসনিক বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সেই সংকট মিটিয়েছিলেন। অথচ মজার ব্যাপার হলো, তার স্বামী জে. বি. কৃপালানি তখন ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। ঘরে ফিরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা থাকলেও রাজনীতির ময়দানে সুচেতা কখনো তার আদর্শের সাথে আপস করেননি।
গান্ধীজির ‘লাঠি’ ও নোয়াখালির সেই দুঃসহ দিনগুলো
১৯৪৬ সালের নোয়াখালির দাঙ্গা ছিল সুচেতা কৃপালানির জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। যখন চারদিকে মৃত্যু আর হাহাকার, তখন মহাত্মা গান্ধী শান্তির দূত হয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সুচেতা ছিলেন সেই অল্প কয়েকজন সাহসী সঙ্গীর একজন, যাঁরা গান্ধীজির সাথে ওই দুর্গম পথে পা বাড়িয়েছিলেন। গ্রাম থেকে গ্রামে হাঁটার সময় গান্ধীজি অনেক সময় সুচেতার কাঁধে ভর দিয়ে চলতেন, তাই সুচেতাকে মজা করে গান্ধীজির ‘জীবন্ত লাঠি’ বলা হতো। তিনি কেবল ত্রাণ বিতরণ করেননি, বরং দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের মনোবল ফেরাতে তাঁদের সাথে রাত কাটিয়েছেন এবং তাঁদের আত্মরক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন।
দেশভাগের ক্ষত ও ‘উদ্বাস্তু মা’ হিসেবে সুচেতা
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে ছিন্নমূল হয়ে ভারতে আসতে শুরু করেন, তখন সুচেতা কৃপালানি তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। বিশেষ করে দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্পে আসা নারীদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। সুচেতা তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন এবং তাঁদের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলেন। এই সময় বহু শরণার্থী নারী তাঁকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মানবিকতা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল প্রতিটি আর্ত মানুষের জন্য এক পরম আশ্রয়।

সংবিধান প্রণেতা হিসেবে এক অনন্য দূরদর্শী
খুব কম মানুষই মনে রাখেন যে, ভারতের সংবিধান রচনার জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সুচেতা কৃপালানি ছিলেন সেই কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ১৫ জন নারী সদস্যের একজন। তিনি সংবিধানে ‘মৌলিক অধিকার’ (Fundamental Rights) সাব-কমিটির সদস্য ছিলেন। সেখানে তিনি দলিত, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে নারীদের ভোটাধিকার ও সমান মজুরির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আজকের ভারতে নারীরা যে সমান অধিকার ভোগ করেন, তার বীজ বপন করেছিলেন সুচেতা কৃপালানির মতো দূরদর্শী নেত্রীরা।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কণ্ঠস্বর। Sucheta Kripalani First Woman Chief Minister
সুচেতা কৃপালানি কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি রাষ্ট্রসংঘের (UN) সাধারণ অধিবেশনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি মানবাধিকার এবং পরাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতার পক্ষে অত্যন্ত তেজস্বী ভাষণ দেন। তাঁর ইংরেজি ও হিন্দি—উভয় ভাষাতেই পাণ্ডিত্য এবং বক্তৃতার শৈলী বিশ্বনেতাদের মুগ্ধ করেছিল।
জীবনের শেষ অঙ্কে এক নীরব ত্যাগের মহিমা
১৯৭১ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার পর তিনি দিল্লির এক সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। তাঁর স্বামী আচার্য কৃপালানিও তখন রাজনীতি থেকে দূরে। এই সময় সুচেতা নিজের আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন। তবে তিনি কখনোই তাঁর অর্জন নিয়ে প্রচার করতে ভালোবাসতেন না। তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল এক অস্থায়ী দায়িত্ব। তাঁর মৃত্যুর পর যখন তাঁর ঘর তল্লাশি করা হয়, তখন দেখা যায় তাঁর আলমারিতে কেবল কয়েক জোড়া সাদা খদ্দরের শাড়ি আর টেবিলে কিছু বই ছাড়া আর কিছুই নেই। একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এমন রিক্ত ও পবিত্র জীবন আজ আমাদের কাছে এক পরম বিস্ময়।
সুচেতা কৃপালানি সম্পর্কে সংশোধিত ৫টি প্রশ্নোত্তর (FAQs about Sucheta Kripalani First Woman Chief Minister)
১. সুচেতা কৃপালানি কীভাবে মহাত্মা গান্ধীর নজর কেড়েছিলেন?
১৯৪৬ সালে যখন নোয়াখালিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন সুচেতা কৃপালানি নিজের জীবনের পরোয়া না করে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি গান্ধীজির সাথে গ্রামে গ্রামে ঘুরে দাঙ্গা দুর্গতদের সেবা করেন এবং শান্তি স্থাপনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর এই অদম্য সাহস এবং আর্তমানবতার প্রতি ভালোবাসা দেখেই গান্ধীজি তাঁকে তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
২. মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সুচেতা কৃপালানি সবচেয়ে বড় কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল উত্তরপ্রদেশের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ ৬২ দিনের ধর্মঘট। প্রশাসনিক দিক থেকে এটি সামলানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু সুচেতা অত্যন্ত ধৈর্য এবং দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে ন্যায্য দাবি শোনা হবে, কিন্তু অহেতুক বিশৃঙ্খলা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান প্রশাসনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৩. মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সুচেতা কৃপালানির প্রশাসনিক সততার একটি উদাহরণ কী?
সুচেতা কৃপালানি তাঁর প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। একবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর স্বামী, যিনি বিরোধী দলের নেতা ছিলেন, তাঁর কাছে একটি তদবির নিয়ে এসেছিলেন। সুচেতা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে প্রশাসনিক কাজে তিনি কোনো স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করবেন না। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও এমন নিরপেক্ষতা ও সততা বিরল।
৪. নারী ক্ষমতায়নে সুচেতা কৃপালানির অবদান কী ছিল?
সুচেতা বিশ্বাস করতেন নারীদের কেবল ঘরের কাজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তিনি অল ইন্ডিয়া মহিলা কংগ্রেসের (All India Mahila Congress) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি দেশজুড়ে ঘুরে ঘুরে সাধারণ নারীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেন এবং তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি মনে করতেন, নারীরা শিক্ষিত ও সচেতন না হলে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না।
৫. সমাজসেবায় সুচেতা কৃপালানির ‘অদৃশ্য’ অবদানগুলো কী ছিল?
রাজনীতিবিদ পরিচয়ের বাইরে সুচেতা ছিলেন একজন দরদী সমাজসেবক। তিনি দেশভাগের সময় উদ্বাস্তু হয়ে আসা হাজার হাজার মানুষের পুনর্বাসনের জন্য দিনরাত কাজ করেছিলেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের আশ্রয়ের জন্য তিনি ‘লোকমর্যাদা’র মতো সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আয়ের প্রায় সবটুকুই বিভিন্ন চ্যারিটেবল ট্রাস্টে দান করে গিয়েছিলেন, যা তাঁর নিঃস্বার্থ পরোপকারী মনের পরিচয় দেয়।




Leave a Comment