Saraswati Rajamani INA Youngest Spy: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অনেক বীরত্বপূর্ণ গল্পে ভরপুর। কিন্তু এমন অনেক নাম আছে, যা ইতিহাসের পাতায় খুব একটা জায়গা পায়নি। আমরা সবাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা জানি। কিন্তু আপনি কি ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী গুপ্তচরের কথা জানেন?
আজ আমরা কথা বলব সরস্বতী রাজামণির সম্পর্কে। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে এমন কিছু কাজ করেছিলেন, যা সিনেমা বা গল্পের নায়িকাদেরও হার মানায়। আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানব কীভাবে একজন কিশোরী নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন।
কে ছিলেন এই সরস্বতী রাজামণি?
সরস্বতী রাজামণি এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যারা আগে থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার রক্তে ছিল দেশপ্রেম। তবে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির সাথে একমত হতে পারেননি।
তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশরা ভারত লুট করছে। তাই তার প্রতিজ্ঞা ছিল, বড় হয়ে অন্তত একজন ব্রিটিশকে তিনি গুলি করবেন। এই জেদ থেকেই তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।
নেতাজির সাথে সাক্ষাৎ এবং আইএনএ-তে যোগদান
যখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আইএনএ-এর (Indian National Army) জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিলেন, তখন সরস্বতী তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেন।
- গয়না দান: তিনি নেতাজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সমস্ত গয়না আইএনএ-র তহবিলে দান করেন।
- কনিষ্ঠতম গুপ্তচর: গয়না দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নেতাজির কাছে তাকে আইএনএ-তে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনুরোধ করেন। তার জেদ এবং সাহস দেখে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাকে আইএনএ-র ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে বা গুপ্তচর বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়।
- ভারতের কনিষ্ঠতম স্পাই: এভাবেই তিনি ভারতের সবচেয়ে কনিষ্ঠ গুপ্তচরে পরিণত হন।
গুপ্তচর হিসেবে সরস্বতী রাজামণির বীরত্ব
আইএনএ-তে যোগ দেওয়ার পর সরস্বতী রাজামণির কাজ মোটেও সহজ ছিল না। তাকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে ব্রিটিশদের মাঝে মিশে যেতে হয়েছিল।
- ছেলে সেজে গুপ্তচরবৃত্তি: তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি এবং তার সঙ্গীরা ছেলেদের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ছেলেদের পোশাকে ব্রিটিশদের গতিবিধির ওপর নজর রেখেছিলেন।
- নেতাজিকে রক্ষা: তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ব্রিটিশদের একটি গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দেওয়া। ব্রিটিশরা নেতাজিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যা সরস্বতী রাজামণি আগে থেকেই জানতে পেরে সতর্ক করে দেন।
সহকর্মীকে উদ্ধার এবং গুলি খাওয়া
সরস্বতী রাজামণির জীবনের সবচেয়ে সাহসী ঘটনাটি ঘটেছিল যখন তার এক সহকর্মী গুপ্তচর ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন।
- নর্তকীর ছদ্মবেশ: সহকর্মীকে বাঁচাতে তিনি একটি নর্তকী বা নাচের মেয়ের ছদ্মবেশ নিয়ে ব্রিটিশ কারাগারে প্রবেশ করেন।
- অফিসারদের মাদক দেওয়া: কারাগারে ব্রিটিশ অফিসারদের তিনি মাদকাচ্ছন্ন করে দেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের সহকর্মীকে নিয়ে পালিয়ে আসেন।
- গুলিবিদ্ধ হওয়া: পালিয়ে আসার সময় ব্রিটিশ প্রহরীদের গুলিতে তার ডান পায়ে গুলি লাগে। তবুও তিনি থামেননি। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই তিনি সফলভাবে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে তার এই সাহসিকতার জন্য তাকে আইএনএ-র ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এর (Rani of Jhansi Brigade) লেফট্যানেন্ট পদে উন্নীত করা হয়।

স্বাধীনতার পর: একটি অবহেলিত জীবন
যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন, স্বাধীন ভারতে তার জীবন কিন্তু খুব একটা সুখের ছিল না।
- চেন্নাইয়ে বসবাস: স্বাধীনতার পর তিনি চেন্নাইয়ের একটি ভাঙাচোরা এক কামরার ফ্ল্যাটে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটান।
- ইতিহাসের বিস্মৃতি: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এত বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও ইতিহাস তাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেক সাহসী নারী ছিলেন, যাদের অবদান আমরা মনে রাখিনি। সরস্বতী রাজামণি তাদেরই একজন।
উপসংহার
সরস্বতী রাজামণির মতো বীরাঙ্গনারা প্রমাণ করেছেন যে, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং সাহস কোনো বয়সের গণ্ডিতে বাধা থাকে না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন, তা আজকের যুবসমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। আমাদের উচিত এই ভুলে যাওয়া বীরদের গল্পগুলো সবার সামনে তুলে ধরা, যাতে ইতিহাস তাদের আর কখনো হারিয়ে না ফেলে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about Saraswati Rajamani INA Youngest Spy)
১. নেতাজির সঙ্গে সরস্বতী রাজামণির প্রথম সাক্ষাৎ কোথায় এবং কীভাবে হয়েছিল?
নেতাজি যখন বার্মার রেঙ্গুনে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখন মাত্র ১০ বছর বয়সী রাজামণি বাগানে বন্দুক নিয়ে নিশানা অভ্যাস করছিলেন। নেতাজি তাকে দেখে অবাক হন এবং জিজ্ঞাসা করেন কেন তিনি বন্দুক চালানো শিখছেন। রাজামণি নির্ভয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, “ব্রিটিশদের মারার জন্য।”
২. কেন নেতাজি তার দেওয়া গয়না ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন?
সরস্বতী রাজামণি যখন তার সমস্ত গয়না আইএনএ-র (INA) তহবিলে দান করেন, তখন নেতাজি ভেবেছিলেন ছোট মেয়েটি ভুল করে বা না বুঝে এগুলো দিয়ে দিয়েছে। তিনি তার বাবার কাছে গিয়ে গয়না ফেরত দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজামণি জেদ ধরেছিলেন যে ওগুলো দেশের কাজের জন্যই ব্যবহার করতে হবে। তার এই দৃঢ়তা দেখেই নেতাজি তাকে ‘সরস্বতী’ নাম দেন।
৩. গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার সময় তিনি কী ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ ব্যবহার করতেন? গুপ্তচরবৃত্তির সময় তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে ‘মণি’ নাম ব্যবহার করতেন। ব্রিটিশ ক্যাম্পে নজরদারি করার জন্য তিনি প্রায়ই একজন অল্পবয়সী ছেলে বা শ্রমিকের বেশ ধরতেন, যাতে কেউ তাকে সন্দেহ না করে।
৪. গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি কীভাবে ধরা পড়া এড়িয়েছিলেন? সহকর্মীকে উদ্ধার করে পালানোর সময় ব্রিটিশদের গুলিতে তার পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধরা পড়া এড়াতে তিনি এবং তার সঙ্গী প্রায় তিন দিন একটি গাছের মগডালে লুকিয়ে ছিলেন। ব্রিটিশরা নিচে তল্লাশি চালালেও তাদের খুঁজে পায়নি। এরপর তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় ৩ দিন পর আইএনএ ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
৫. স্বাধীন ভারতে তার শেষ জীবন কেমন কেটেছিল? দুর্ভাগ্যবশত, স্বাধীন ভারতে তিনি দীর্ঘকাল বিস্মৃতির আড়ালে ছিলেন। চেন্নাইয়ের একটি ছোট জরাজীর্ণ ঘরে তিনি অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতেন। ২০০৬ সালে সংবাদমাধ্যমে তার করুণ অবস্থার কথা উঠে এলে তৎকালীন তামিলনাড়ু সরকার তাকে একটি বাড়ি এবং আর্থিক সাহায্য প্রদান করে।




Leave a Comment