Ritu Karidhal ISRO Mission Director: ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে যখনই কোনও যুগান্তকারী মাইলফলকের কথা আসে, তখন একটি নাম সবার আগে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে – ঋতু কারিধাল শ্রীবাস্তব (Ritu Karidhal Srivastava)। পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য থাকা মহাকাশ বিজ্ঞানের জগতে তিনি কেবল নিজের জায়গাই তৈরি করেননি, বরং সমগ্র ভারতকে গর্বিত করেছেন।
একসময় লখনউয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের যে মেয়েটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত চাঁদের আকার কেন বদলায়, সেই মেয়েটিই আজ ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ (Rocket Woman of India) হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নালু মেয়ে থেকে কীভাবে তিনি ইসরো-র (ISRO) অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানী এবং ভারতের চন্দ্রযান ও মঙ্গলযান মিশনের সফলতার অন্যতম কান্ডারি হয়ে উঠলেন, আসুন সেই রোমাঞ্চকর গল্পটি আজ আমরা শুনি।
খবরের কাগজের কাটিং জমানো মেয়েটির চোখে ছিল অসীম আকাশ!
১৯৭৫ সালের ১৩ই এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের লখনউ শহরের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ঋতু। তাঁর পরিবারে শিক্ষার ওপর সবসময় জোর দেওয়া হতো, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনও দামি কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন পড়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। তবুও ছোটবেলা থেকেই রাতের আকাশ, চাঁদ, তারা এবং মহাকাশের প্রতি তাঁর ছিল এক দুর্নিবার এবং অদ্ভুত আকর্ষণ।
যখন অন্যান্য ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, ছোট্ট ঋতু তখন খবরের কাগজে নাসা (NASA) বা ইসরো-র (ISRO) কোনও খবর ছাপা হলে তা কেটে সযত্নে নিজের ডায়েরিতে জমিয়ে রাখতেন। মহাকাশযানের ছবি এবং বিজ্ঞানীদের সাফল্যের খবর পড়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন তিনিও ওই অসীম শূন্যে ভারতের হয়ে কিছু পাঠাবেন। তাঁর বাবা-মা সবসময় তাঁর এই কৌতূহলকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং তাকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।
লখনউ থেকে বেঙ্গালুরু: নিজের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে স্বপ্নের দিকে দৌড়!
লখনউয়ের নবযুগ কন্যা বিদ্যালয় থেকে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তিনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি পদার্থবিদ্যায় (Physics) অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে বি.এসসি (B.Sc) এবং এম.এসসি (M.Sc) সম্পন্ন করেন। পদার্থবিদ্যার প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, মাস্টার্স শেষ করে তিনি সেখানেই ডক্টরেট (Ph.D) কোর্সে ভর্তি হন এবং কিছুকাল শিক্ষকতাও করেন।
কিন্তু তাঁর চোখ তো সব সময় ওই আকাশের দিকেই ছিল! মহাকাশ নিয়ে পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছায় তিনি গেট (GATE) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান, বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-এ অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স করার সুযোগ পান। উত্তর ভারতের চেনা পরিবেশ ছেড়ে দক্ষিণ ভারতে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া একদম সহজ ছিল না, কিন্তু ঋতুর লক্ষ্য ছিল একদম স্থির।
১৯৯৭ সাল: যেদিন ইসরোর দরজা খুলে গেল একজন তরুণ বিজ্ঞানীর জন্য!
১৯৯৭ সালের নভেম্বর মাস। ঋতু কারিধালের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি অবশেষে সত্যি হয়। তিনি বেঙ্গালুরুতে ইসরোতে (ISRO) একজন তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করেন। প্রথম থেকেই তিনি তাঁর অসাধারণ মেধা এবং প্রবল পরিশ্রম দিয়ে সিনিয়র বিজ্ঞানীদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। তিনি বিভিন্ন স্যাটেলাইট মিশনে কাজ শুরু করেন এবং মহাকাশযানের গতিপথ ও নিয়ন্ত্রণ (Orbit and Attitude Control) নিয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
মঙ্গলযান: ১৮ মাসের রুদ্ধশ্বাস প্রস্তুতি আর একটা ‘মস্তিষ্ক’ তৈরির গল্প!
ঋতু কারিধালের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে যখন তাঁকে ভারতের ঐতিহাসিক মার্স অরবিটার মিশন (Mars Orbiter Mission – MOM) বা ‘মঙ্গলযান’-এর ডেপুটি অপারেশন ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই মিশনটির চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল। ভারতকে প্রথম চেষ্টাতেই মঙ্গলে পৌঁছাতে হতো, তাও আবার বিশ্বের সবচেয়ে কম বাজেটে এবং মাত্র ১৮ মাসের প্রস্তুতিতে।
ঋতু এবং তাঁর দলের ওপর একটি অত্যন্ত জটিল দায়িত্ব ছিল—মহাকাশযানটির জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা ‘অটোনমি সিস্টেম’ (Autonomy System) তৈরি করা। পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দূরত্ব এতটাই বেশি যে, একটি সিগন্যাল পৌঁছাতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। তাই কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে মহাকাশযানটিকে যাতে পৃথিবী থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই আশ্চর্য ‘মস্তিষ্ক’ তৈরি করেছিলেন ঋতু কারিধাল।
২০১৪ সালে যখন মঙ্গলযান সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে, তখন সারা বিশ্ব ভারতের বিজ্ঞানীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। এই মিশনের সফলতার কারণেই তাঁকে ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ উপাধি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক মিশনের ওপর ভিত্তি করেই বলিউডে ‘মিশন মঙ্গল’ (Mission Mangal) সিনেমাটি তৈরি হয়, যেখানে তাঁর অবদানের ছায়া পরিষ্কার দেখা যায় বিদ্যা বালানের চরিত্রে।

চাঁদের মাটিতে ভারতের পদচিহ্ন: চন্দ্রযানের পেছনের আসল কারিগর!
মঙ্গলযানের অভাবনীয় সাফল্যের পর ইসরো তাঁকে আরও বড় এবং কঠিন দায়িত্ব দেয়। তিনি ২০১৯ সালের চন্দ্রযান-২ (Chandrayaan-2) মিশনের মিশন ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন। যদিও সেই মিশনের ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ চাঁদের মাটিতে সফট ল্যান্ডিং করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু ঋতু এবং তাঁর দল সেই সাময়িক ব্যর্থতা থেকে অনেক বড় শিক্ষা নিয়েছিলেন।
এরপর ২০২৩ সালে আসে সেই ঐতিহাসিক চন্দ্রযান-৩ (Chandrayaan-3) মিশন। এই মিশনেও তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। অবশেষে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারত বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের রহস্যময় দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে মহাকাশযান অবতরণ করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে। ঋতু কারিধালের মতো বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম ছাড়া এই অসাধ্য সাধন কখনোই সম্ভব ছিল না।
অফিস, সংসার আর সন্তানের হোমওয়ার্ক: কীভাবে সামলালেন এত কিছু?
একজন শীর্ষ মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি ঋতু কারিধাল দুই সন্তানের জননী। মঙ্গলযানের সময় তাঁর ছেলেমেয়েরা বেশ ছোট ছিল। সেই সময় তিনি অফিসে টানা ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন। অফিস থেকে ফিরে তিনি সন্তানদের হোমওয়ার্ক করাতেন, তাদের সাথে সময় কাটাতেন এবং তারা ঘুমিয়ে পড়লে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টে পর্যন্ত আবারও মিশনের কাজে বসে যেতেন।
তাঁর স্বামী অবিনাশ এবং তাঁর পরিবার সবসময় তাঁকে এই কঠিন রুটিন মেনে চলতে সাহায্য করেছেন। তিনি নিজের জীবনে প্রমাণ করেছেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে একজন নারী একই সাথে পরিবার এবং দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সামলাতে পারেন।
যে সম্মানগুলো ঋতু কারিধাল–র মাথায় মুকুটের মতো জ্বলজ্বল করছে!
বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন:
- ২০০৭ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এবং ‘মিসাইল ম্যান’ ড. এ.পি.জে আবদুল কালামের হাত থেকে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক ‘ISRO Young Scientist Award’ গ্রহণ করেন।
- লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এই গর্বিত প্রাক্তনীকে সম্মানসূচক ডক্টরেট (D.Sc) ডিগ্রি প্রদান করে।
- মঙ্গলযান মিশনে তাঁর অসাধারণ কাজের জন্য তিনি ‘ISRO Team Award’ লাভ করেন।
- লিঙ্গবৈষম্য ভেঙে স্টেম (STEM – Science, Technology, Engineering, and Mathematics) ফিল্ডে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরেও তিনি বহুবার প্রশংসিত হয়েছেন।
স্বপ্ন দেখার কোনও সীমা নেই…
ঋতু কারিধালের এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের কাহিনী নিঃসন্দেহে প্রতিটি ভারতবাসীর জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়। শত বাধা পেরিয়ে একজন মধ্যবিত্ত নারীর এই মহাকাশ জয় আমাদের বারবার প্রমাণ করে যে, স্বপ্ন দেখার কোনও সীমা নেই। আপনি যদি সত্যি কিছু চান, তবে পুরো মহাকাশও আপনাকে পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs about Ritu Karidhal ISRO Mission Director)
১. ঋতু কারিধাল কে (Ritu Karidhal ISRO Mission Director)?
ঋতু কারিধাল শ্রীবাস্তব হলেন ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো-র (ISRO) একজন সিনিয়র বিজ্ঞানী। তিনি ভারতের ঐতিহাসিক মঙ্গলযান এবং চন্দ্রযান-৩ মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকে খবরের কাগজের কাটিং জমানো মেয়েটি আজ নিজেই ভারতের প্রতিটি খবরের কাগজের প্রথম পাতার শিরোনাম হয়ে উঠেছেন।
২. ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ কাকে বলা হয়?
মহাকাশ গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য ঋতু কারিধালকে ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ বলা হয়। এই উপাধিটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মেধার স্বীকৃতি নয়, বরং ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানে যুক্ত সমস্ত নারী বিজ্ঞানীদের প্রতি একটি সম্মান।
৩. ঋতু কারিধাল কোথায় পড়াশোনা করেছেন?
তিনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc) থেকে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স করেন। পদার্থবিদ্যার প্রতি তীব্র ভালোবাসার কারণেই তিনি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শুরু করেছিলেন, যদিও মহাকাশ বিজ্ঞানের ডাকে পরে তিনি আইআইএসসি-তে চলে যান।
৪. ঋতু কারিধাল কোন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন?
তিনি ২০০৭ সালে ড. এ.পি.জে আবদুল কালামের হাত থেকে ‘ইসরো ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড’ পান। এছাড়া তিনি ‘ইসরো টিম অ্যাওয়ার্ড’ এবং আরও অনেক সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেছেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁকে নারীদের ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সম্মানিত করা হয়েছে।
৫. মিশন মঙ্গল সিনেমায় কি তাঁর চরিত্র আছে?
হ্যাঁ, বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মিশন মঙ্গল’-এ বিদ্যা বালানের চরিত্রটি ঋতু কারিধাল এবং তাঁর সহকর্মী মহিলা বিজ্ঞানীদের অবদানের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে ঘরের সাধারণ কাজ ও বিজ্ঞানকে মিলিয়ে এই নারী বিজ্ঞানীরা মহাকাশ মিশনের মতো জটিল বিষয়কে সফল করেছিলেন।




Leave a Comment