Mary Kom Legacy and Success Story: মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোটখাটো চেহারার নারীটি যখন বক্সিং রিঙের মাঝখানে দাঁড়ান, তখন কেবল বিপক্ষ প্রতিপক্ষ কাঁপে না, বরং গোটা ভারতের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তিনি মাংতে চুংনুইজাং মেরি কম। আমাদের গর্ব, আমাদের অলঙ্কার এবং বিশ্ব ক্রীড়া জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
যাঁর হাতের প্রতিটি পাঞ্চে মিশে থাকে মণিপুরের পাহাড়ের কাঠিন্য এবং ভারতের তেরঙ্গার মর্যাদা, সেই মেরি কমের গল্প কেবল পদক জয়ের নয়—এটি হাড়ভাঙা খাটুনি, অবজ্ঞা আর পাহাড়প্রমাণ বাধা টপকে শিখরে পৌঁছানোর এক অমর মহাকাব্য।
মেরি কমের শৈশব: অভাবের সাথে লড়াই ও বক্সিং গ্লাভসের স্বপ্ন
মণিপুরের চুরাচাঁদপুর জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষক দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া মেরি জানতেন অভাব কী। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি। মাঠে কাজ করা এবং ভাইবোনদের দেখভাল করার পাশাপাশি তাঁর ভেতরে বড় হচ্ছিল এক অদম্য জেদ।
১৯৯৮ সালে বক্সার ডিংকো সিংয়ের এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয় মেরিকে পথ দেখায়। যখন তিনি প্রথম বক্সিং শুরু করেন, তখন সমাজ তো বটেই, এমনকি তাঁর বাবাও সায় দেননি। কারণ বক্সিং ছিল তখন মূলত ‘পুরুষের খেলা’। তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেন। কিন্তু মেরি জানতেন, ইতিহাস তাঁরাই লেখেন যারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙার সাহস রাখেন।
আরও পড়ুন: অলিম্পিক জয়ী প্রথম ভারতীয় মহিলা কে
অপ্রতিরোধ্য যাত্রা: যখন মাতৃত্ব হয়ে উঠল মেরির সবচেয়ে বড় শক্তি
সাধারণত একজন নারী মা হওয়ার পর খেলাধুলা থেকে বিদায় নেন, এটাই সমাজের চিরচেনা চিত্র। কিন্তু মেরি কম এখানেই অনন্য। ২০০৫ সালের পর বিয়ে এবং যমজ সন্তানের মা হওয়ার পর যখন সবাই ভেবেছিল মেরি ফুরিয়ে গেছেন, তখনই তিনি সবচেয়ে জোরালো পাঞ্চটি মারলেন।
দীর্ঘ বিরতির পর রিংয়ে ফিরে তিনি কেবল পদকই জেতেননি, বরং একের পর এক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জিতে প্রমাণ করলেন—মাতৃত্ব কোনও বাধা নয়, বরং এটি একজন নারীর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাঁর এই লড়াই ‘কামব্যাক’ শব্দটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

‘ম্যাগনিফিসেন্ট মেরি’: কেন তিনি বিশ্ব বক্সিংয়ের মুকুটহীন সম্রাট?
বিশ্ব বক্সিংয়ের ইতিহাসে মেরি কম একমাত্র নারী যিনি ৮ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পদক জিতেছেন। এর মধ্যে ৬টিই স্বর্ণপদক। তাঁর ঝুলিতে আছে ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ পদক, ২০১৪ এশিয়ান গেমসের স্বর্ণ এবং ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসের স্বর্ণ।
কিন্তু এই সংখ্যার চেয়েও বড় হলো তাঁর লড়াকু মানসিকতা। তিনি যখন অলিম্পিক পোডিয়ামে তেরঙ্গার দিকে তাকিয়েছিলেন, তখন তাঁর চোখের সেই জল ছিল ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা মুক্তির অশ্রু। তাঁর ক্ষিপ্র গতি আর টেকনিক্যাল পাঞ্চ আজও বিশ্বের বাঘা বাঘা বক্সারদের গবেষণার বিষয়।
ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতির মুকুট
মেরি কম কেবল রিঙেই জয়ী হননি, তিনি জিতেছেন ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানগুলোও। ভারত সরকার তাঁকে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ভূষিত করেছে:
- পদ্মবিভূষণ (২০২০): ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান।
- পদ্মভূষণ (২০১৩): তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান।
- মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন (২০০৯): ক্রীড়াক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান।
- পদ্মশ্রী (২০০৬) ও অর্জুন পুরস্কার (২০০৩)।
এই পুরস্কারগুলো প্রমাণ করে যে, শ্রম আর একাগ্রতা থাকলে ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকে উঠে এসে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো সম্ভব।
আরও পড়ুন: দাবার বোর্ডে হার না মানা এক ‘মা’! ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার কোনেরু হাম্পির অজানা কাহিনী
‘Unbreakable’ লিগ্যাসি: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথপ্রদর্শক
মেরি কম কেবল একজন অ্যাথলেট নন; তিনি সেই সব মেয়েদের কণ্ঠস্বর যারা সামাজিক বেড়াজালে স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। তাঁর আত্মজীবনী ‘Unbreakable’ আজ তরুণ প্রজন্মের জন্য গাইডবুক। তিনি প্রমাণ করেছেন যে মণিপুরের ধুলোবালি থেকেও বিশ্বজয়ী হওয়া সম্ভব।
বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ‘Mary Kom Regional Boxing Foundation’-এর মাধ্যমে কয়েকশ প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি চান, তাঁর দেশ যেন আরও অনেক ‘গোল্ডেন পাঞ্চ’ উপহার পায়।
মেরি কম সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নাবলী (FAQs On Mary Kom Legacy and Success Story)
১. মেরি কম কেন ভারতের গর্ব এবং বিশ্ব ক্রীড়া জগতের আইকন হিসেবে পরিচিত?
উত্তর: মেরি কম কেবল ভারতের একমাত্র নারী বক্সার নন, তিনি বিশ্বের একমাত্র নারী অ্যাথলেট যিনি বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে রেকর্ড ৮টি পদক (যার মধ্যে ৬টি স্বর্ণ) জিতেছেন। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জয় করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ভারতীয় নারীরা বিশ্বমঞ্চে অপরাজেয়। প্রতিকূল পরিবেশ, চরম দারিদ্র্য এবং সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিজের স্বপ্নকে ছিনিয়ে এনেছেন, তা ভারতের কোটি কোটি স্বপ্নবাজ তরুণের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে না।
২. মেরি কমের ক্যারিয়ারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল এবং তিনি তা কীভাবে জয় করেছেন?
উত্তর: মেরি কমের লড়াই ছিল বহুস্তরীয়। প্রথমত, তাঁর মণিপুরি আদিবাসী পরিচয় এবং চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেই সময়ে বক্সিংকে কেবল ‘পুরুষের খেলা’ মনে করা হতো, ফলে সমাজ ও পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁকে এই খেলা বেছে নিতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ছিল বিয়ের পর এবং যমজ সন্তানের মা হওয়ার পর রিংয়ে ফেরা। অনেকেই ভেবেছিলেন তাঁর ক্যারিয়ার শেষ, কিন্তু তিনি তাঁর ‘Unbreakable’ ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে মাতৃত্ব কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এক নতুন শক্তির উৎস।
৩. মেরি কম কোন কোন রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হয়েছেন এবং তাঁর অবদানের স্বীকৃতি কী?
উত্তর: ভারতের ক্রীড়া ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশের তিনটি সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পেয়েছেন। তিনি ২০২০ সালে পদ্মবিভূষণ, ২০১৩ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০০৬ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন (২০০৯) এবং অর্জুন পুরস্কার (২০০৩) তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। এই সম্মাননাগুলো কেবল তাঁর পদকের স্বীকৃতি নয়, বরং ভারতের ক্রীড়া মানচিত্রে নারীদের স্থান সুসংহত করার জন্য তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধা।
৪. মেরি কমের জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিনেমাটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ২০১৪ সালে ওমুং কুমার পরিচালিত এবং প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনীত ‘Mary Kom’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এটি কেবল একটি বায়োপিক নয়, বরং ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক নারীর বিশ্বজয়ের এক প্রামাণ্য দলিল। সিনেমাটি মেরি কমের জীবনের সেই সব অন্ধকার দিক এবং ত্যাগের গল্পগুলো সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে যা আগে অজানাই ছিল। এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ভারতে নারী বক্সিংয়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায় এবং হাজার হাজার মেয়ে বক্সিং গ্লাভস হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পায়।
৫. মেরি কমের বর্তমান ব্যস্ততা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: রিংয়ের লড়াই থেকে দূরে থাকলেও মেরি কম আজও ভারতীয় বক্সিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বর্তমানে ভারতের রাজ্যসভার একজন প্রাক্তন সদস্য হিসেবে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেছেন। এছাড়া তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো নতুন মেরি কম তৈরি করা। নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘Mary Kom Regional Boxing Foundation’-এর মাধ্যমে তিনি মণিপুরের দরিদ্র ও প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ এবং থাকার সুবিধা দিচ্ছেন। তিনি চান তাঁর দেশ যেন বক্সিংয়ে আরও অনেক অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করতে পারে।

Leave a Comment