Indira Gandhi the Iron lady of India: ভারতের ইতিহাসে যদি এমন কোনও নাম থাকে যা শুনলে সাহস আর শক্তির কথা মনে পড়ে, তবে তিনি হলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁকে নিয়ে অনেক বড় বড় বই লেখা হয়েছে, কিন্তু আজকের এই ব্লগে আমরা খুব সহজভাবে জানব কেন তিনি আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
ছোটবেলার ইন্দিরা: একাকীত্ব থেকে শক্তি
১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এলাহাবাদের এক বিখ্যাত পরিবারে জন্ম হয় ইন্দিরার। তাঁর বাবা ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ছোটবেলায় ইন্দিরাকে সবাই খুব শান্ত মেয়ে হিসেবে চিনতেন। তাঁর বাবা-মা দেশের কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি প্রায়ই একাকী বোধ করতেন। কিন্তু এই একাকীত্বই তাঁকে মানসিকভাবে খুব শক্ত করে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘প্রিয়দর্শিনী’।
রাজনীতিতে আসা: ‘বোবা পুতুল’ থেকে দেশের নেত্রী
১৯৬৪ সালে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর ইন্দিরা রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হন। ১৯৬৬ সালে তিনি যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী (Indira Gandhi the Iron lady of India) হন, তখন অনেক অভিজ্ঞ নেতা ভেবেছিলেন তিনি খুব একটা কাজ করতে পারবেন না। অনেকে তাঁকে মজা করে ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ (বোবা পুতুল) বলতেন। কিন্তু ইন্দিরা খুব দ্রুতই নিজের কাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে তিনি কারো হাতের পুতুল নন, বরং একজন সাহসী দেশনায়ক।
আরও পড়ুন: অজেয় মেরি কম: ভারতের সেই ‘ম্যাগনিফিসেন্ট’ কন্যা, যিনি বিশ্বকে নত হতে শিখিয়েছেন
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু
আমাদের বাঙালির কাছে ইন্দিরা গান্ধী এক দেবীর মতো। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন তিনি সারা বিশ্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভারতের সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। কোটি কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকম সাহায্য করেছিলেন। তাঁর কারণেই মাত্র ১৩ দিনে আমরা জয়ী হতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে তাঁর অবদান কোনোদিন ভোলার নয়।
গরিব মানুষের প্রিয় নেত্রী
ইন্দিরা গান্ধী সবসময় সাধারণ মানুষের কথা ভাবতেন। তাঁর বিখ্যাত স্লোগান ছিল— “গরিবী হঠাও” (দারিদ্র্য দূর করো)। তিনি বড় বড় ব্যাঙ্কগুলোকে সরকারের অধীনে নিয়ে আসেন যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ঋণ নিতে পারে এবং উন্নতি করতে পারে। এই কারণেই গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘ইন্দিরা আম্মা’।

শেষ দিন ও আত্মত্যাগ
ইন্দিরা গান্ধীর জীবন ছিল দেশের জন্য উৎসর্গ করা। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি তাঁরই দেহরক্ষীদের গুলিতে মারা যান। মৃত্যুর ঠিক আগের দিন তিনি বলেছিলেন, “আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে শক্তিশালী করবে।” তিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, কিন্তু মাথা নত করেননি। প্রমাণ করে দিয়েছেন যে আমরা নারী আমরা পারি।
ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (More about Indira Gandhi the Iron lady of India)
১. পরিবেশ রক্ষায় পথিকৃৎ
অনেকেই জানেন না যে, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কান্ডারি। ১৯৭২ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে তিনিই ছিলেন একমাত্র বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই ভারতে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন’ (Wildlife Protection Act, 1972) পাস হয় এবং বাঘ বাঁচানোর জন্য বিখ্যাত ‘প্রজেক্ট টাইগার’ শুরু হয়।
২. মহাকাশে ভারতের প্রথম পদক্ষেপ
ইন্দিরা গান্ধীর আমলেই ভারত মহাকাশ গবেষণায় বড় সাফল্য পায়। ১৯৮৪ সালে যখন প্রথম ভারতীয় হিসেবে রাকেশ শর্মা মহাকাশে যান, তখন ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “উপর থেকে ভারতকে কেমন লাগছে?” রাকেশ শর্মা উত্তর দিয়েছিলেন— “সারে জাহাঁ সে আচ্ছা” (বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ)।
আরও পড়ুন: দাবার বোর্ডে হার না মানা এক ‘মা’! ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার কোনেরু হাম্পির অজানা কাহিনী
৩. পরমাণু শক্তিতে ভারতের উত্থান (পোখরান-১)
১৯৭৪ সালে রাজস্থানের পোখরানে ভারত প্রথম সফল পরমাণু পরীক্ষা চালায়, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ (Smiling Buddha)। এই সাহসিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে ভারত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র।
৪. সবুজ বিপ্লব (Green Revolution)
একসময় ভারতে খাদ্যের খুব অভাব ছিল এবং অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। ইন্দিরা গান্ধী কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ‘সবুজ বিপ্লব’ সফল করেন। এর ফলে ভারত খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে এবং আজ আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি আমাদের দেশের অন্ন আমাদের মাটিতেই ফলে।
৫. সিকিমের ভারতভুক্তি
ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার আরেকটি বড় প্রমাণ হলো ১৯৭৫ সালে সিকিমকে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এটি ভারতের মানচিত্রকে যেমন পূর্ণতা দিয়েছিল, তেমনি উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছিল।
ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে ৫টি অজানা ও জরুরি প্রশ্ন (FAQs about Indira Gandhi the Iron lady of India)
১. ইন্দিরা গান্ধী কেন নিজের বিদেশি পুতুল পুড়িয়ে ফেলেছিলেন?
স্বদেশী আন্দোলনের সময় যখন বিদেশি পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়, তখন পাঁচ বছরের ছোট্ট ইন্দিরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিদেশি পুতুলটি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
২. বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী কেন সেনাবাহিনী তুলে নিয়েছিলেন?
তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন ভারত কোনও ভূখণ্ড দখল করতে আসেনি, বরং একটি জাতির অধিকার রক্ষা করতে এসেছিল। এটি ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মহানুভবতার পরিচয়।
৩. তাঁকে কেন ‘লৌহমানবী’ (Iron Lady) বলা হয়?
১৯৭১-এর যুদ্ধ এবং জরুরি অবস্থার মতো কঠিন সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত সাহসের সাথে নেওয়ায় এবং বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর চাপে মাথা নত না করায় তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
৪. তিনি কি তাঁর নিজের মৃত্যু সম্পর্কে জানতেন?
মৃত্যুর ঠিক আগের দিনগুলোতে তাঁর কথায় ও বক্তৃতায় বার বার আত্মত্যাগের সুর শোনা যেত। এমনকি তাঁর নিরাপত্তা সরানোর প্রস্তাব এলেও তিনি বলেছিলেন, “আমি আমার আপনজনের ওপর অবিশ্বাসের ছায়া দেখতে চাই না।”
৫. ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কে ছিলেন?
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ বহন করেন।
৬. ইন্দিরা গান্ধী কেন নিজের পদবী ‘গান্ধী’ রেখেছিলেন?
অনেকে মনে করেন তিনি মহাত্মা গান্ধীর আত্মীয় ছিলেন, কিন্তু আসলে তা নয়। ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে বিয়ের পর তিনি এই পদবী গ্রহণ করেন। তবে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল।




Leave a Comment