History of High Heels: মেয়েরা যখন খুব সুন্দর করে সেজেগুজে কোনো পার্টিতে বা অনুষ্ঠানে যায়, তখন পায়ের হাই হিল জুতোটা সাজের সাথে বেশ মানানসই লাগে। কিন্তু একটু পরেই সেই সুন্দর জুতো পরে হাঁটা এক চরম যন্ত্রণায় পরিণত হয়। পায়ের পাতায় এবং গোড়ালিতে অসহ্য ব্যথা শুরু হয়। তবুও আমরা আরও একটু সুন্দর দেখানোর জন্য হাসিমুখে এই কষ্টটা সহ্য করি।
কিন্তু সম্প্রতি ‘শে দ্য পিপল’ (shethepeople) নামের একটি পেজের পোস্টে একটি খুব চমকপ্রদ তথ্য আমাদের চোখে পড়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই হাই হিল জুতো নাকি আদতে হাঁটার জন্যই তৈরি করা হয়নি! কথাটি শুনে নিশ্চয়ই আপনার খুব অবাক লাগছে? ভাবছেন, হাঁটার জন্য না হলে জুতো কেন তৈরি হবে? আসুন, আজ এই যন্ত্রণাদায়ক হাই হিলের পেছনের এক অদ্ভুত এবং অজানা ইতিহাস আমরা জেনে নিই।
অবাক করা সত্যি: হাই হিল কিন্তু মোটেও মেয়েদের জন্য তৈরি হয়নি!
হ্যাঁ, আপনি একদম ঠিক পড়েছেন। আজ যে হাই হিল জুতোকে আমরা নারীত্বের বা মেয়েদের ফ্যাশনের প্রতীক বলে মনে করি, তা কিন্তু মেয়েদের জন্য তৈরি হয়নি। এই জুতোর ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পারস্যে, যাকে আজ আমরা ইরান নামে চিনি।
সেই দশম শতাব্দীতে পারস্যের দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার সৈন্যরা এই হিল জুতো পরতেন। যুদ্ধ করার সময় ঘোড়ার পিঠে বসে তীর চালানোর জন্য তাদের উঠে দাঁড়াতে হতো। তখন ঘোড়ার জিনের বা রেকাবের সাথে পা শক্ত করে আটকে রাখার জন্য জুতোর নিচে এই উঁচু হিলের খুব দরকার ছিল। অর্থাৎ, এই জুতো হাঁটার জন্য একদমই তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষদের সুবিধা এবং সুরক্ষার জন্য।

ঘোড়ার পিঠ থেকে কীভাবে ইউরোপের রাজপ্রাসাদে পৌঁছল এই হিল?
পারস্যের এই ঘোড়সওয়ারদের অদ্ভুত জুতোর কথা ধীরে ধীরে ইউরোপের রাজাদের কানে পৌঁছায়। ইউরোপের অভিজাত পুরুষরা তখন মনে করলেন, এই জুতো পরলে তাদেরও বেশ লম্বা এবং শক্তিশালী দেখাবে।
সতেরো শতকে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই (King Louis XIV) এই জুতোর সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন। তাঁর নিজের উচ্চতা বেশ কম ছিল। তাই তিনি সবসময় লাল রঙের অত্যন্ত উঁচু হিল জুতো পরতেন। রাজাকে দেখে তাঁর দরবারের অন্য পুরুষরাও এই হিল জুতো পরা শুরু করেন। সেই যুগে হাই হিল ছিল পুরুষদের ক্ষমতা, প্রচুর টাকা এবং আভিজাত্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের এই জুতো পরার কোনও অধিকারই ছিল না।
‘আমার পুরোনো আমিকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি!’ প্রিয়াঙ্কার কোন ভুলগুলো মেয়েদের জানা উচিত
পুরুষদের অহংকারের ফ্যাশন কীভাবে মেয়েদের আলমারিতে জায়গা করে নিল?
ধীরে ধীরে সমাজের উঁচু স্তরের বা অভিজাত মেয়েরাও এই হিল জুতো পরতে শুরু করেন। তাঁরা চাইতেন পুরুষদের মতো শক্তিশালী এবং গম্ভীর দেখাতে। তাই তাঁরা পুরুষদের পোশাক এবং জুতোর নকল করা শুরু করেন। এইভাবেই হাই হিল জুতো মেয়েদের ফ্যাশনের মায়াবী দুনিয়ায় প্রথম প্রবেশ করে।
কিন্তু পরে যখন ফরাসি বিপ্লব শুরু হলো, তখন ইতিহাস আবার বদলাতে শুরু করে। পুরুষরা এই আভিজাত্যের জুতো পরা একদম ছেড়ে দিলেন। তারা সমাজে সমতার প্রতীক হিসেবে সাধারণ সমতল বা ফ্ল্যাট জুতো পরতে শুরু করলেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, মেয়েদের ফ্যাশনে এই হিল জুতো থেকেই গেল। সময়ের সাথে সাথে জুতোর হিল আরও সরু, আরও সূঁচালো এবং অনেক বেশি উঁচু হতে লাগল।
হাঁটার জন্য না হলেও, কেন আমরা আজও এই কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করি?
আপনি হয়তো ভাবছেন, যে জুতো পরলে এত কষ্ট হয়, তা আমরা আজও কেন পরি? এর প্রধান কারণ হলো আধুনিক যুগের চাপিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যের মাপকাঠি। বর্তমান সমাজ আমাদের বোঝায় যে, হাই হিল পরলে মেয়েদের বেশি আকর্ষণীয় এবং আত্মবিশ্বাসী দেখায়। আমাদের হাঁটার ধরন বদলে যায়। আমাদের কিছুটা লম্বা এবং রোগা দেখায়।
এই সাময়িক সৌন্দর্যের জন্যই আমরা এত কষ্ট সহ্য করি। কিন্তু ভাইরাল হওয়া ওই পোস্টটি আমাদের ঠিক এই জায়গাটিতেই ভাবতে বাধ্য করেছে। যে জুতো তৈরিই হয়েছিল ঘোড়ার পিঠে বসার জন্য, তাকে হাঁটার কাজে ব্যবহার করাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই জরুরি প্রশ্নটা আমাদের সবার আজ নিজেকে করা উচিত।
ফ্যাশন করুন, কিন্তু নিজের পায়ের কষ্টটাকেও এবার একটু ছুটি দিন!
ফ্যাশন করা বা সুন্দর সাজাটা খুব দারুণ একটি ব্যাপার। কিন্তু ফ্যাশনের জন্য নিজের শরীরকে কষ্ট দেওয়াটা একদমই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হাই হিল পরার কারণে অনেক মেয়েরই হাঁটুতে এবং কোমরে মারাত্মক ব্যথা শুরু হয়। পায়ের স্নায়ুগুলো দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই সুন্দর দেখানোর পাশাপাশি নিজের আরামের দিকেও নজর দেওয়া খুব জরুরি। আপনার যদি হিল পরতে ভালো লাগে, তবে কোনও বিশেষ দিনে পরুন। কিন্তু প্রতিদিনের কাজের জন্য বা দীর্ঘক্ষণ হাঁটার জন্য সাধারণ আরামদায়ক জুতো বেছে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী, হিল জুতো কিন্তু আরাম করে হাঁটার জন্য মোটেও তৈরি হয়নি!
সন্তান মানুষ করা আজকাল খুব কঠিন! আধুনিক যুগের বাবা-মায়েদের জন্য গান্ধারীর চরম শিক্ষা
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about History of High Heels)
১. হাই হিল জুতো কি মেয়েদের হাঁটার সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছিল?
না, হাই হিল জুতো আদতে হাঁটার জন্য বা মেয়েদের ব্যবহারের জন্য একেবারেই তৈরি হয়নি।
২. হাই হিল জুতো প্রথম কাদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল?
প্রাচীন পারস্যের পুরুষ ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের জন্য এই জুতো প্রথম তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ঘোড়ায় চড়ার সময় তারা নিজেদের পা শক্ত করে আটকে রাখতে পারেন।
৩. ইউরোপে কোন রাজা এই উঁচু জুতোর সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন?
ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই (King Louis XIV) এই জুতোর সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিলেন এবং উচ্চতা বাড়ানোর জন্য তিনি লাল রঙের হাই হিল পরতেন।
৪. পুরুষরা কেন হাই হিল পরা চিরতরে ছেড়ে দিলেন?
ফরাসি বিপ্লবের সময় সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ দূর করতে এবং সমতার প্রতীক হিসেবে পুরুষরা হাই হিল পরা ছেড়ে সমতল জুতো পরতে শুরু করেন।
৫. নিয়মিত হাই হিল পরলে আমাদের শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
নিয়মিত এই জুতো পরলে কোমর, হাঁটু এবং পায়ের গোড়ালিতে মারাত্মক ব্যথা শুরু হতে পারে এবং পায়ের স্নায়ুগুলো চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।




Leave a Comment