First Female Doctor of India Anandi Bai Joshi: ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই অন্ধকার যুগে, যখন ভারতের নারীদের চার দেয়ালের বাইরে বেরোনোই ছিল দুষ্কর, তখন এক অদম্য নারী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিলেন সুদূর আমেরিকায়। তিনি আর কেউ নন, ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক আনন্দীবাই জোশী (Anandi Bai Joshi)। তাঁর জীবন কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়, বরং কুসংস্কার আর সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নাম।
কেন তিনি আজও লক্ষ লক্ষ নারীর অনুপ্রেরণা, তা জানতে এই বিশেষ প্রতিবেদনটি পড়ুন:
জীবন সংগ্রামের শুরু: ১০ বছর বয়সেই বিয়ে
১৮৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করা আনন্দীবাইয়ের শৈশব মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় তাঁর থেকে ২০ বছরের বড় বিপত্নীক গোপালরাও জোশীর সাথে। তবে গোপালরাও ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ। তিনি আনন্দীবাইকে পড়াশোনা শেখানোর কঠোর দায়িত্ব নেন, যা সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজে ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
কেন তিনি ডাক্তার হতে চাইলেন? (১৪ বছর বয়সে সন্তানশোক)
আনন্দীবাইয়ের ডাক্তার হওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বুকফাটা হাহাকার। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সঠিক চিকিৎসার অভাবে মাত্র দশ দিন পরেই সেই নবজাতক মারা যায়। এই শোক আনন্দীবাইকে ভেঙে না ফেলে বরং এক বজ্রকঠিন সংকল্পে আবদ্ধ করে—তিনি নিজে ডাক্তার হয়ে ভারতের অন্যান্য মায়েদের কোল খালি হওয়া রোধ করবেন।

সমুদ্রযাত্রা ও আমেরিকার দিনলিপি
তৎকালীন হিন্দু সমাজে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া ছিল ‘ধর্মনাশের’ শামিল। প্রবল সামাজিক লাঞ্ছনা ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও ১৮৮৩ সালে তিনি একাই আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে Women’s Medical College of Pennsylvania-তে তিনি ভর্তি হন।
- অমানুষিক সংগ্রাম: বিদেশের হাড়কাঁপানো শীত এবং সম্পূর্ণ আলাদা খাদ্যাভ্যাস তাঁর শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলে। খাঁটি নিরামিষাশী হওয়ায় তিনি সেখানে কেবল চাল আর ডাল খেয়ে দিন কাটাতেন। অপর্যাপ্ত পুষ্টি আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি যক্ষ্মা (TB) রোগে আক্রান্ত হন।
- বিজয় ও সাফল্য: চরম শারীরিক কষ্টের মাঝেও পড়াশোনা থামাননি তিনি। ১৮৮৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে এম.ডি (MD) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর এই সাফল্যে খোদ ভিক্টোরিয়া রানীর দরবার থেকেও অভিনন্দন বার্তা এসেছিল।
দেশে ফেরা এবং অকাল মৃত্যু
১৮৮৬ সালের শেষের দিকে তিনি এক বীরের মর্যাদায় ভারতে ফিরে আসেন। তাঁকে কোলাপুর রাজ্যের আলবার্ট এডওয়ার্ড হাসপাতালের ‘ফিজিশিয়ান-ইন-চার্জ’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, নিজের শরীরের ওপর দিয়ে যাওয়া ধকল এবং যক্ষ্মা রোগের কারণে মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৮৮৭ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আনন্দী বাই জোশীর উত্তরাধিকার ও প্রভাব
আনন্দী বাই জোশী কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি বিপ্লব। তাঁর সাহস ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য চিকিৎসার দুয়ার চিরতরে খুলে দিয়েছিল। তাঁর সম্মানার্থে মহারাষ্ট্র সরকার বর্তমানে তরুণী গবেষকদের জন্য ‘আনন্দী বাই জোশী অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। এমনকি মহাকাশে শুক্র গ্রহের একটি গর্তের নাম (Anandibai crater) তাঁর নামেই রাখা হয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
১. ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তার কে ছিলেন?
আনন্দী বাই জোশী ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তার যিনি বিদেশ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। যদিও একই সময়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীও ডাক্তারি পড়েন, তবে আনন্দীবাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আগে পেয়েছিলেন।
২. আনন্দী বাই জোশী কোথায় পড়াশোনা করেছিলেন?
তিনি আমেরিকার পেনসিলভানিয়া ওম্যান’স মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল ‘হিন্দু আর্যদের প্রসূতিবিদ্যা’ (Obstetrics among the Aryan Hindus), যেখানে তিনি প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রশংসা করেছিলেন।
৩. তাঁর স্বামী গোপালরাও জোশীর ভূমিকা কী ছিল?
গোপালরাও কেবল স্বামী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আনন্দীবাইয়ের প্রধান মেন্টর। তিনি সমাজকে তুচ্ছজ্ঞান করে স্ত্রীকে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করেন। আনন্দীবাইয়ের উচ্চশিক্ষার জন্য গোপালরাও মিশনরিদের সাহায্য চেয়েছিলেন এবং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের কঠোর সমালোচনা ও অপমান সহ্য করেও স্ত্রীর পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন।
৪. আনন্দী বাই জোশী কত বছর বয়সে মারা যান?
যক্ষ্মা রোগের কারণে মাত্র ২২ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, যে ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অসুস্থতার কারণে দেশে ফিরে তিনি আর কোনো রোগীকে সেবা করার সুযোগ পাননি।
৫. আনন্দী বাই জোশীর জীবন নিয়ে কি কোনো চলচ্চিত্র আছে?
হ্যাঁ, তাঁর জীবন নিয়ে মারাঠি ভাষায় ‘আনন্দী গোপাল’ নামে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সিনেমা রয়েছে, যা প্রতিটি মানুষের দেখা উচিত। এছাড়া দূরদর্শনে ‘আনন্দী বাই জোশী’ নামে একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিক প্রচারিত হয়েছিল এবং তাঁর জীবনীর ওপর ভিত্তি করে চমৎকার কিছু উপন্যাসও রচিত হয়েছে।




Leave a Comment