Chicken Fry Biryani Recipe: বিরিয়ানি ভালোবাসেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন কাজ। আমরা সাধারণত বাড়িতে বা রেস্তোরাঁয় চিকেন দম বিরিয়ানি খেয়ে থাকি। কিন্তু আপনি কি কখনো ‘চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি’ (Chicken Fry Biryani) খেয়েছেন? দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে এই বিরিয়ানি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেখানে এই খাবারটিকে ভালোবেসে ‘কোডি ভেপুডু বিরিয়ানি’ (Kodi Vepudu Biryani) বলা হয়।
এই বিরিয়ানির বিশেষত্ব হলো এর রান্নার পদ্ধতি। সাধারণ দম বিরিয়ানিতে চাল এবং কাঁচা মাংস একসাথে ভাপে রান্না করা হয়। কিন্তু এই রেসিপিতে মশলাদার মুচমুচে চিকেন ফ্রাই তৈরি করে, সেটি সুগন্ধি পোলাও বা বাসমতি রাইসের সাথে মেশানো হয়। যারা একটু ঝাল এবং মশলাদার খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি সেরা একটি পদ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজভাবে এই দারুণ রেসিপিটি শিখব।
কেন দম বিরিয়ানির বদলে ফ্রাই বিরিয়ানি বানাবেন?
অনেকেই বাড়িতে দম বিরিয়ানি বানাতে ভয় পান। কারণ চাল বেশি সেদ্ধ হয়ে যাওয়া বা মাংস কাঁচা থেকে যাওয়ার একটি ভয় থাকে। কিন্তু চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানিতে সেই ভয় একদম নেই।
এখানে মাংস এবং রাইস আলাদাভাবে রান্না করা হয়। তাই নতুন রাঁধুনিরাও খুব সহজে এটি বানাতে পারেন। তাছাড়া, মাংস আগে থেকে ভেজে নেওয়ায় এর স্বাদ অনেক বেশি কড়া এবং সুস্বাদু হয়। তাজা কারি পাতা এবং কাঁচা লঙ্কার ফ্লেভার এই বিরিয়ানিকে একদম অন্য লেভেলে নিয়ে যায়।
রেস্তোরাঁর স্বাদে ঘরেই বানান স্পাইসি চিকেন ভিন্দালু! আঙুল চাটতে বাধ্য হবেন সবাই
চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ
এই রান্নাটিকে আমরা দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমটি হলো চিকেন ফ্রাই (কোডি ভেপুডু) তৈরি এবং দ্বিতীয়টি হলো সুগন্ধি রাইস বা পোলাও তৈরি। নিচে সব উপকরণের একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
চিকেন ফ্রাইয়ের জন্য (For Chicken Fry):
- মুরগির মাংস: ৫০০ গ্রাম (হাড় ছাড়া বা বোনলেস চিকেন হলে সবচেয়ে ভালো হয়)।
- আদা-রসুন বাটা: ১ টেবিল চামচ।
- লাল লঙ্কা গুঁড়ো: ১ চা চামচ (ঝাল অনুযায়ী)।
- কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো: ১ চা চামচ (সুন্দর লাল রঙের জন্য)।
- ধনে গুঁড়ো: ১ চা চামচ।
- গরম মশলা গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ।
- হলুদ গুঁড়ো: ১/৪ চা চামচ।
- লেবুর রস: ১ টেবিল চামচ।
- কারি পাতা: ১০-১২টি তাজা পাতা।
- কাঁচা লঙ্কা: ৩-৪টি (মাঝখান থেকে চেরা)।
- তেল: ৩-৪ টেবিল চামচ।
- লবণ: স্বাদমতো।
বিরিয়ানি রাইসের জন্য (For Biryani Rice):
- বাসমতি চাল: ২ কাপ (উচ্চ মানের লম্বা চাল)।
- পেঁয়াজ: ২টি বড় মাপের (খুব মিহি করে লম্বা স্লাইস করা)।
- আদা-রসুন বাটা: ১ চা চামচ।
- গোটা গরম মশলা: ২টো তেজপাতা, ৪টি লবঙ্গ, ৩টি এলাচ, ১ টুকরো দারুচিনি এবং ১ চা চামচ শাহী জিরে।
- তাজা পুদিনা পাতা: এক মুঠো (কুচানো)।
- তাজা ধনেপাতা: এক মুঠো (কুচানো)।
- ঘি এবং তেল: ২ টেবিল চামচ করে।
- গরম জল: ৩.৫ কাপ (২ কাপ চালের জন্য)।
- লবণ: স্বাদমতো।

চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি তৈরির ধাপে ধাপে পদ্ধতি (Step-by-Step Process of Chicken Fry Biryani Recipe)
রান্নাটি শুনতে বড় মনে হলেও পদ্ধতিটি খুবই সহজ। আপনি যদি ধাপগুলো ঠিকমতো অনুসরণ করেন, তবে আপনার রান্নাও রেস্তোরাঁকে হার মানাবে।
ধাপ ১: বাসমতি চাল প্রস্তুত করা (Preparing the Rice)
যেকোনো ভালো বিরিয়ানির প্রথম শর্ত হলো পারফেক্ট চাল। প্রথমে বাসমতি চাল খুব ভালোভাবে ৩-৪ বার জল পাল্টে ধুয়ে নিন। এরপর চালগুলো পরিষ্কার জলে অন্তত ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এতে চাল রান্নার পর অনেক লম্বা এবং ঝরঝরে হবে।
ধাপ ২: চিকেন ম্যারিনেশন (Marinating the Chicken)
মাংসের টুকরোগুলো ধুয়ে জল একদম ঝরিয়ে নিন। একটি পাত্রে মাংস নিয়ে তাতে আদা-রসুন বাটা, লাল লঙ্কা গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, হলুদ, ধনে গুঁড়ো, গরম মশলা, লেবুর রস এবং স্বাদমতো লবণ দিন। হাত দিয়ে খুব ভালোভাবে মশলাগুলো মাংসের গায়ে মাখিয়ে নিন। এই ম্যারিনেট করা মাংসটি অন্তত ৩০ মিনিট ঢেকে রাখুন।
ধাপ ৩: চিকেন ফ্রাই তৈরি করা (Frying the Chicken)
একটি প্যানে বা কড়াইতে তেল গরম করুন। তেল গরম হলে ম্যারিনেট করে রাখা মাংসের টুকরোগুলো প্যানে দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে মাংসগুলো ভাজতে থাকুন। মাংস থেকে জল বের হবে, সেই জলেই মাংস সেদ্ধ হয়ে যাবে।
জল শুকিয়ে গেলে এবং মাংসের গায়ে সুন্দর বাদামি বা ভাজা ভাজা রঙ ধরলে বুঝবেন চিকেন ফ্রাই প্রায় তৈরি। একদম শেষে কড়াইতে তাজা কারি পাতা এবং চেরা কাঁচা লঙ্কাগুলো দিয়ে দিন। আরও ২ মিনিট নেড়ে গ্যাস বন্ধ করে দিন। দারুণ সুগন্ধি এই ‘কোডি ভেপুডু’ বা চিকেন ফ্রাই একপাশে সরিয়ে রাখুন।
ধাপ ৪: সুগন্ধি রাইস বা পোলাও রান্না (Cooking the Flavored Rice)
এবার একটি বড় এবং ছড়ানো হাঁড়িতে ঘি এবং তেল একসাথে গরম করুন। এতে তেজপাতা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি এবং শাহী জিরে ফোঁড়ন দিন। মশলা থেকে সুগন্ধ বের হলে স্লাইস করে রাখা পেঁয়াজ দিয়ে দিন। পেঁয়াজগুলো সুন্দর সোনালি বা বেরেস্তার মতো ভাজা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
পেঁয়াজ ভাজা হলে আদা-রসুন বাটা দিয়ে একটু কষিয়ে নিন। এবার ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখা বাসমতি চাল হাঁড়িতে দিয়ে দিন। চালগুলো মশলার সাথে ২ মিনিট হালকা হাতে ভেজে নিন। এতে চাল রান্নার পর গলে যাবে না।
ধাপ ৫: জল মেশানো এবং চাল সেদ্ধ করা (Adding Water and Boiling)
চাল ভাজা হলে এতে ঠিক ৩.৫ কাপ গরম জল দিয়ে দিন। সাথে স্বাদমতো লবণ, কুচানো পুদিনা পাতা এবং ধনেপাতা মেশান। জল ফুটতে শুরু করলে হাঁড়ির মুখ ঢাকনা দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিন।
গ্যাসের আঁচ একদম কমিয়ে (Low flame) ১০ থেকে ১২ মিনিট রান্না হতে দিন। মাঝে বারবার ঢাকনা খুলবেন না। সময় শেষ হলে গ্যাস বন্ধ করুন। কিন্তু সাথে সাথে ঢাকনা খুলবেন না। আরও ১০ মিনিট এভাবেই ভাপে বা দমে (Resting time) রেখে দিন।
ধাপ ৬: ফ্রাই ও রাইস মেশানো (Mixing and Serving)
১০ মিনিট পর হাঁড়ির ঢাকনা খুলুন। দেখবেন চাল একদম ঝরঝরে এবং সুন্দর সেদ্ধ হয়েছে। এবার একটি বড় পাত্রে পরিবেশনের আগে সেই সুগন্ধি রাইস এবং আগে থেকে ভেজে রাখা মশলাদার চিকেন ফ্রাই একসাথে খুব হালকা হাতে মিশিয়ে নিন। খুব বেশি জোরে ঘাটবেন না, তাহলে চাল ভেঙে যেতে পারে।
ব্যাস, আপনার গরম গরম এবং অত্যন্ত সুস্বাদু চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি পরিবেশনের জন্য একদম তৈরি!
পারফেক্ট বিরিয়ানির জন্য কিছু গোপন টিপস (Pro Tips of Chicken Fry Biryani Recipe)
প্রথমবার রান্না করলেও এই টিপসগুলো মেনে চললে আপনার বিরিয়ানি একদম পারফেক্ট হবে:
১. হাড় ছাড়া মাংস (Boneless Chicken): এই রেসিপিতে হাড় ছাড়া মাংস ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। এতে মাংসের ভেতরে মশলা খুব ভালোভাবে ঢোকে এবং খাওয়ার সময় কোনো অসুবিধা হয় না।
২. জলের সঠিক মাপ: বাসমতি চাল রান্নায় জলের মাপ খুব জরুরি। সাধারণত ১ কাপ চালের জন্য ১.৫ থেকে ১.৭৫ কাপ জল একদম সঠিক মাপ। গরম জল ব্যবহার করলে রাইস খুব সুন্দর ঝরঝরে হয়।
৩. কারি পাতার ম্যাজিক: অন্ধ্র স্টাইলের এই রান্নায় কারি পাতার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এটি এড়িয়ে গেলে আসল কোডি ভেপুডু ফ্লেভারটি আপনি পাবেন না। মাংস ভাজার একদম শেষ মুহূর্তে কারি পাতা দেবেন, এতে গন্ধ অটুট থাকবে।
কীভাবে পরিবেশন করবেন? (Serving Suggestions)
এই চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি নিজে থেকেই অত্যন্ত মশলাদার এবং সুস্বাদু। তাই এর সাথে খুব ভারী কোনো গ্রেভির প্রয়োজন হয় না।
ঠান্ডা এবং রিফ্রেশিং পেঁয়াজ-শসার রায়তা (Raita) এর সাথে সবচেয়ে ভালো মানায়। আপনি চাইলে এর সাথে সেদ্ধ ডিম এবং সামান্য স্যালাড পরিবেশন করতে পারেন। অন্ধ্রপ্রদেশে অনেক সময় এই বিরিয়ানির সাথে ‘সালান’ বা পাতলা গ্রেভিও পরিবেশন করা হয়।
উপসংহার (Conclusion)
চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি বা কোডি ভেপুডু বিরিয়ানি আপনার রোজকার একঘেয়ে খাবারের তালিকায় একটি দারুণ পরিবর্তন আনতে পারে। এর মশলাদার চিকেন এবং পুদিনা-ধনেপাতার সুগন্ধি চালের সংমিশ্রণ আপনার মন ভালো করে দেবে।
বাড়িতে কোনো পার্টি থাকলে বা ছুটির দিনে পরিবারকে স্পেশাল কিছু খাওয়াতে চাইলে এই রেসিপিটি অবশ্যই ট্রাই করবেন। দম বিরিয়ানির মতো কোনো জটিলতা না থাকায় যে কেউ এটি খুব সহজেই বানিয়ে ফেলতে পারেন। সঠিক পদ্ধতি মেনে রান্না করুন এবং রেস্তোরাঁর স্বাদ নিজের ডাইনিং টেবিলে নিয়ে আসুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about )
১. কোডি ভেপুডু (Kodi Vepudu) কথাটির অর্থ কী?
তেলেগু ভাষায় ‘কোডি’ মানে হলো মুরগি বা চিকেন, আর ‘ভেপুডু’ মানে হলো ফ্রাই বা ভাজা। অর্থাৎ, মশলাদার চিকেন ফ্রাইকেই কোডি ভেপুডু বলা হয়।
২. এই বিরিয়ানিতে কি আলু দেওয়া যায়?
আসল দক্ষিণ ভারতীয় ফ্রাই বিরিয়ানিতে সাধারণত আলু দেওয়া হয় না। তবে আপনি চাইলে আলাদা করে আলু ভেজে রাইসের সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন।
৩. রাইস যাতে গলে না যায় তার জন্য কী করব?
চাল রান্নার আগে অন্তত ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখবেন এবং জলের মাপ একদম ঠিক রাখবেন। রান্না শেষ হওয়ার পর সাথে সাথে না ঘেঁটে অন্তত ১০ মিনিট ভাপে বা দমে বিশ্রাম নিতে দেবেন।
৪. চিকেন ফ্রাই বিরিয়ানি কি খুব বেশি ঝাল হয়?
অন্ধ্রপ্রদেশের খাবার সাধারণত বেশ ঝাল হয়। তবে আপনি বাড়িতে বানালে কাঁচা লঙ্কা এবং লাল লঙ্কা গুঁড়োর পরিমাণ নিজের স্বাদ অনুযায়ী কমিয়ে বা বাড়িয়ে নিতে পারেন।
৫. আগের দিনের বেঁচে যাওয়া ভাত দিয়ে কি এই রেসিপি বানানো যাবে?
অবশ্যই। আপনার কাছে যদি আগের দিনের সাদা বাসমতি ভাত থাকে, তবে শুধু চিকেন ফ্রাইটি তৈরি করে সেই গরম ভাতের সাথে মিশিয়ে নিলেও দারুণ স্বাদ পাওয়া যায়।




Leave a Comment