Bhawana Kanth First Female Fighter Pilot: মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়োজাহাজ দেখার স্মৃতি আমাদের সবারই আছে। আকাশে প্লেন উড়ে গেলে আমরা হাত নাড়তাম আর ভাবতাম, ইশ! যদি পাখির মতো ওই আকাশে উড়তে পারতাম! বড় হওয়ার সাথে সাথে আমাদের অনেকেরই সেই স্বপ্ন হারিয়ে যায়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো সমাজ শিখিয়েই দেয় যে, আকাশ ছোঁয়া মেয়েদের কাজ নয়।
বিশেষ করে ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান চালানোর মতো ভয়ংকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তো পুরোপুরি পুরুষদের জন্যই তৈরি! অন্তত কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশের মানুষের এমনটাই ধারণা ছিল। কিন্তু এই সব পুরোনো আর সেকেলে চিন্তাভাবনাকে এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন বিহারের এক সাধারণ ঘরের মেয়ে। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, ফাইটার জেটের ককপিট কোনো ছেলে বা মেয়ের ভেদাভেদ বোঝে না; সে শুধু বোঝে মেধা আর সাহস।
আজ আমরা জানব ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট ভাবনা কান্থের (Bhawana Kanth) গল্প। চলুন দেখি, কীভাবে একটা সাধারণ মেয়ে দেশের অন্যতম বড় ইতিহাস তৈরি করলেন!
বিহারের ছোট্ট শহরের সেই মেয়েটা, যার চোখ সব সময় আকাশে থাকত!
ভাবনা কান্থের জন্ম বিহারের দ্বারভাঙায়, তবে তাঁর বড় হওয়া বেগুসরাইয়ের মতো একটি ছোট্ট শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং মা ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমনটা হয়, মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে ভালো চাকরি করতে বলা হতো।
কিন্তু ভাবনার মনের ভেতরে তো একটা অদ্ভুত ঝড় চলত। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। তিনি যখনই টিভিতে এয়ার ফোর্সের প্যারেড বা ফাইটার প্লেন দেখতেন, তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠত। তিনি জানতেন না কীভাবে এই স্বপ্ন সত্যি হবে, কারণ তখনো ভারতীয় বিমানবাহিনীতে (IAF) মেয়েদের ফাইটার পাইলট হিসেবে নেওয়া হতো না। কিন্তু তবুও, মনের কোনো এক কোণে তিনি ওই নীল আকাশটাকে নিজের করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে সোজা এয়ার ফোর্সে! স্বপ্ন যখন সত্যি হওয়ার পথে…
বাবা-মায়ের কথা মতো ভাবনা বেঙ্গালুরুর একটি কলেজ থেকে মেডিকেল ইলেকট্রনিক্স নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। একটি বড় আইটি কোম্পানিতে তাঁর চাকরিও হয়ে যায়। কিন্তু ওই যে, মন পড়ে আছে আকাশে!
ঠিক সেই সময়েই, ২০১৫ সালে ভারত সরকার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার ঘোষণা করে যে, ভারতীয় বিমানবাহিনীতে এবার থেকে মেয়েরাও ফাইটার পাইলট হতে পারবে। এই খবরটা ভাবনার কাছে যেন ভগবানের আশীর্বাদের মতো ছিল। তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি। সোজা এয়ার ফোর্সের পরীক্ষায় বসেন এবং নিজের মেধা দিয়ে সুযোগও পেয়ে যান। শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর প্রশিক্ষণ।

২০১৬ সাল: যেদিন বদলাল ইতিহাস, আর ফাইটার জেটে বসল মেয়ের নাম!
ফাইটার পাইলট হওয়ার ট্রেনিংটা কোনো সাধারণ ট্রেনিং নয়। এটা রীতিমতো হাড়হিম করা একটা ব্যাপার। গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ বলের প্রবল চাপ সহ্য করা, মাথা ঠান্ডা রেখে চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। কিন্তু ভাবনা হার মানেননি।
অবশেষে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। ২০১৬ সালের জুন মাস। ভাবনা কান্থ, অবনী চতুর্বেদী এবং মোহনা সিং—এই তিনজন নারীকে ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট হিসেবে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত! যে খাকি ওভারঅল বা জি-স্যুট (G-suit) একসময় শুধু পুরুষদের গায়ে দেখা যেত, তা সেদিন এক সাধারণ মেয়ের গায়ে দারুণ মানিয়েছিল।
মিগ-২১ বাইসন (MiG-21 Bison) ওড়ানো কি মুখের কথা?
ফাইটার পাইলট তো হলেন, কিন্তু আসল পরীক্ষা তো তখনও বাকি! ভাবনাকে ওড়াতে দেওয়া হলো ভারতের অন্যতম ভয়ংকর এবং চ্যালেঞ্জিং ফাইটার জেট ‘মিগ-২১ বাইসন’ (MiG-21 Bison)। এই যুদ্ধবিমান ওড়ানোটা অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
কিন্তু ভাবনা তো ভয় পাওয়ার মেয়ে নন! ২০১৮ সালে তিনি প্রথমবার একা (Solo flight) এই মিগ-২১ ওড়ান। আর ২০১৯ সালে তিনি প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট হিসেবে দিনের বেলায় কমব্যাট বা যুদ্ধের মিশনে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। একটু কল্পনা করে দেখুন তো, হাজার হাজার ফুট ওপরে, শব্দের চেয়েও বেশি বেগে ছুটে চলা একটা ফায়ার-ব্রিদিং মেশিনকে একা হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন একটা মেয়ে! এই দৃশ্যটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
সাধারণ মানুষের চোখে ‘নারী শক্তি’র আসল রূপ!
২০২১ সালের সাধারণতন্ত্র দিবস বা রিপাবলিক ডে প্যারেডের কথা হয়তো আপনাদের অনেকেরই মনে আছে। সেদিন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো মহিলা ফাইটার পাইলট প্যারেডের ট্যাবলয়ে অংশ নিয়েছিলেন, আর তিনি ছিলেন আমাদের ভাবনা কান্থ। সেদিন টিভির পর্দায় তাঁকে দেখে দেশের লাখ লাখ ছোট্ট মেয়ের চোখে নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল।
দেশের জন্য তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতা এবং নারীদের সামনে এক বিশাল দৃষ্টান্ত তৈরি করার জন্য, ২০২০ সালে ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতি তাঁকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘নারী শক্তি পুরস্কার’ (Nari Shakti Puraskar) দিয়ে সম্মানিত করেন।
লখনউয়ের গলি থেকে চাঁদে পাড়ি: ভারতের ‘রকেট ওম্যান’ ঋতু কারিধালের সাফল্যের অজানা গল্প
‘গ্লাস সিলিং’ ভেঙে ফেলার গল্প
ভাবনা কান্থের এই গল্পটা শুধু আকাশে ওড়ার গল্প নয়। এটা হল সমাজের তৈরি করে দেওয়া একটা বিরাট বড় কাচের দেওয়াল বা ‘গ্লাস সিলিং’ ভেঙে ফেলার গল্প। তিনি বারবার বলেছেন, “মেশিন বোঝে না যে তাকে কোনো পুরুষ ওড়াচ্ছে নাকি নারী। মেশিন শুধু ইনপুট বোঝে।”
তাই আপনার বাড়ির ছোট্ট মেয়েটা যদি কখনো বড় কোনো স্বপ্ন দেখে, তাকে ভয় দেখাবেন না। তাকে বোঝান যে, সে চাইলে ফাইটার জেটও ওড়াতে পারে। ভাবনা কান্থের এই আকাশছোঁয়া গল্পটা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মেয়েদের স্বপ্ন দেখার কোনো সীমা নেই। আর স্বপ্ন যদি সত্যি করার জেদ থাকে, তবে পুরো আকাশটাই আপনার হাতের মুঠোয়!
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQs about Bhawana Kanth First Female Fighter Pilot)
১. ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট কে?
ভাবনা কান্থ (Bhawana Kanth) হলেন ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলটদের মধ্যে অন্যতম। ২০১৬ সালে তিনি, অবনী চতুর্বেদী এবং মোহনা সিং একসাথে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ফাইটার স্ট্রিমে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েন।
২. ভাবনা কান্থ ভারতের কোন রাজ্যের মেয়ে?
ভাবনা কান্থের জন্ম বিহারের দ্বারভাঙায় এবং তাঁর বেড়ে ওঠা বিহারের বেগুসরাই শহরে। তিনি একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন।
৩. ভাবনা কান্থ কোন যুদ্ধবিমান বা ফাইটার জেট ওড়ান?
ভাবনা কান্থ ভারতীয় বিমানবাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী এবং চ্যালেঞ্জিং ফাইটার জেট ‘মিগ-২১ বাইসন’ (MiG-21 Bison) ওড়ানোর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত।
৪. তিনি কি সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে অংশ নিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, ২০২১ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসে (Republic Day) তিনি প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট হিসেবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ট্যাবলয়ে অংশ নিয়ে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছিলেন।
৫. তাঁর এই সাফল্যের জন্য তিনি কী পুরস্কার পেয়েছেন?
নারীদের জন্য এক বিশাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এবং প্রথা ভাঙার জন্য ২০২০ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘নারী শক্তি পুরস্কার’-এ ভূষিত করেন।




Leave a Comment