Best Foods to Eat and Avoid During Periods: পিরিয়ড বা মাসিক প্রতিটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব রয়েছে। পিরিয়ড চলাকালীন একজন নারীর শরীরে হরমোনের যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, তার প্রভাব পড়ে তার হজম ক্ষমতা, মেজাজ এবং শক্তির স্তরের ওপর। অনেক নারী এই সময়ে তীব্র তলপেটে ব্যথা (Dysmenorrhea), পিঠের নিচের অংশে টান ধরা এবং প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, পিরিয়ডের এই দিনগুলোতে আপনি থালায় কী রাখছেন, তা আপনার ব্যথার তীব্রতা নির্ধারণে ৫০% ভূমিকা রাখে। সঠিক খাবার যেমন আপনার পেশিকে শিথিল করতে পারে, তেমনি ভুল খাবার আপনার শরীরে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে কষ্ট বাড়িয়ে দিতে পারে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব পিরিয়ডের সময় কোন খাবার খাওয়া উচিত এবং কোনটি বর্জনীয়।
পিরিয়ডের সময় কোন খাবারগুলো খাওয়া উচিত (Foods to Include During Periods)
পিরিয়ডের সময় শরীর থেকে যে পরিমাণ রক্ত এবং খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়, তা পূরণ করতে নিচের খাবারগুলো আপনার খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত:
আয়রন ও ভিটামিন-বি সমৃদ্ধ খাবার (Iron & Vitamin-B)
পিরিয়ডের সময় গড়ে ৩০ থেকে ৮০ মিলিলিটার রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা থেকে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা হতে পারে।
- পালং শাক ও কচু শাক: সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। বিশেষ করে পালং শাকে থাকা ফলেট এবং ভিটামিন-বি শরীরকে নতুন রক্তকণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে। এটি নিয়মিত খেলে পিরিয়ড পরবর্তী ক্লান্তি অনেক কমে যায়।
- ডিম ও মুরগির মাংস: প্রোটিনের পাশাপাশি ডিমে রয়েছে ভিটামিন বি-৬ এবং বি-১২, যা মেজাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মুরগির মাংস আয়রন শোষণে শরীরকে শক্তি দেয়।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও চর্বিযুক্ত মাছ (Omega-3)
পিরিয়ডের ব্যথার প্রধান কারণ হলো ‘প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন’ নামক একটি হরমোন সদৃশ উপাদান, যা জরায়ুর সংকোচন ঘটায়।
- সামুদ্রিক মাছ: ইলিশ, রূপচাঁদা বা টুনা মাছে প্রচুর ওমেগা-৩ থাকে। এটি শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে ব্যথা এবং প্রদাহ দূর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার খান, তাদের পিরিয়ডের ক্র্যাম্প অন্যদের তুলনায় অনেক কম হয়।
ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ ফল (Magnesium & Potassium)
পেশির মোচড়ানো বা কামড়ানো ভাব কমাতে খনিজ উপাদানগুলো জাদুর মতো কাজ করে।
- কলা: কলায় প্রচুর পটাশিয়াম এবং ভিটামিন বি-৬ থাকে। এটি পিরিয়ডের সময় হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পেশির টান কমায়।
- ডার্ক চকোলেট: পিরিয়ডের সময় মিষ্টি খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা বা ক্রেভিং হয়। সাধারণ মিষ্টির বদলে ৭০% কোকো সমৃদ্ধ ডার্ক চকোলেট খান। এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম আপনার স্নায়ুকে শান্ত করবে এবং মেজাজ ভালো রাখবে।
প্রোবায়োটিক ও ক্যালসিয়াম (Probiotics & Calcium)
পিরিয়ডের সময় অনেকেরই হজমে সমস্যা বা পেটে গ্যাস হয়। এছাড়া হরমোনের প্রভাবে হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে।
- টক দই: দইয়ে থাকা ‘লাইভ কালচার’ বা ভালো ব্যাকটেরিয়া পাকস্থলীকে ঠান্ডা রাখে এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
- দুধ ও পনির: ক্যালসিয়াম শুধু হাড় শক্ত করে না, এটি পিরিয়ডের আগে হওয়া পিএমএস (PMS) বা খিটখিটে মেজাজ শান্ত করতে সাহায্য করে।

পিরিয়ডের সময় কোন খাবারগুলো খাওয়া উচিত নয় (Foods to Avoid)
আপনার অজান্তেই কিছু প্রিয় খাবার আপনার পিরিয়ডের দিনগুলোকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলতে পারে। চলুন জেনে নিই পিরিয়ডের সময় কোন খাবার বর্জনীয়:
অতিরিক্ত নুন ও সোডিয়ামযুক্ত খাবার
নুন শরীরে জল ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ায়। এর ফলে পেট ফুলে থাকে, অস্বস্তি হয় এবং ওজন সাময়িকভাবে বেড়ে গেছে বলে মনে হয়।
কী কী খাবেন না: পটেটো চিপস, চানাচুর, ফাস্ট ফুড (পিৎজা, বার্গার), এবং ক্যানজাত খাবার। এগুলোতে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম আপনার পিরিয়ড ক্র্যাম্পকে আরও তীব্র করে তোলে।
ক্যাফেইন ও এনার্জি ড্রিংকস
কফি বা কড়া চা পিরিয়ডের সময় সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্ষতির কারণ।
কী কী খাবেন না: ক্যাফেইন রক্তনালীকে সংকুচিত করে (Vasoconstriction), যা জরায়ুর রক্তপ্রবাহে বাধা দেয় এবং ব্যথা বাড়ায়। এছাড়া এটি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে আদা চা বা পুদিনা চা পান করুন।
রিফাইনড সুগার বা অতিরিক্ত চিনি
মিষ্টি জাতীয় খাবার আপনার রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
কী কী খাবেন না: এর ফলে শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন বেড়ে যায়। পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত চিনি খেলে ত্বকে ব্রণ বা একনের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং মুড সুইং মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
রেড মিট বা মাটন
গরু বা খাসির মাংসে প্রচুর চর্বি থাকে যা শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন হরমোনের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।
কী কী খাবেন না: জরায়ুর পেশি বেশি সংকুচিত হয় এবং তলপেটে অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি হয়। পিরিয়ডের কয়েকদিন লাল মাংসের বদলে হালকা মাছ বা সবজি খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
পিরিয়ড ডায়েট চার্ট: সারাদিন কী খাবেন এবং কেন খাবেন?
পিরিয়ডের দিনগুলোতে শরীরের বিপাকীয় হার (Metabolism) পরিবর্তিত হয়, তাই সঠিক সময়ে সঠিক খাবার গ্রহণ করা জরুরি। নিচে একটি আদর্শ ডায়েট চার্টের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হল:
- সকাল (ব্রেকফাস্ট): দিনের শুরুটা করুন এক গ্লাস ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে, যা শরীরের টক্সিন বের করতে সাহায্য করবে। এরপর ওটস বা কর্নফ্লেক্সের মতো ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন। ওটস আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, যা হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে হওয়া খিটখিটে ভাব কমায়। এর সাথে কলা বা আপেল যোগ করুন; কলার পটাশিয়াম পেশির টান কমায় এবং আপেলের ফাইবার পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
- দুপুর (লাঞ্চ): দুপুরে সাধারণ ভাতের বদলে লাল চালের ভাত খাওয়া বেশি উপকারী কারণ এতে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার থাকে। এর সাথে প্রচুর পরিমাণে ডাল রাখুন যা প্রোটিনের জোগান দেবে। ছোট মাছ (যেমন মলা বা ঢেলা) ক্যালসিয়াম ও ওমেগা-৩ এর চমৎকার উৎস। এক বাটি সবুজ শাকসবজি (যেমন পালং বা কলমি শাক) আপনার শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে অ্যানিমিয়া রোধ করবে।
- বিকেল (স্ন্যাকস): বিকেলের নাস্তায় ভাজাভুজি এড়িয়ে এক মুঠো কাঠবাদাম বা আখরোট খান। এগুলোতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন-ই শরীরের প্রদাহ ও ব্যথা কমায়। সাথে এক কাপ আদা চা পান করুন। আদার ‘জিনজারল’ উপাদানটি জরায়ুর পেশিকে শিথিল করে প্রশান্তি দেয়।
- রাত (ডিনার): রাতের খাবার হওয়া উচিত হালকা কিন্তু পুষ্টিকর। হালকা রুটি বা গ্রিলড চিকেন হজম করা সহজ এবং এটি শরীরের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। সবশেষে এক বাটি টক দই অবশ্যই রাখুন। দইয়ের প্রোবায়োটিক পিরিয়ডের সময় হওয়া হজমের গোলমাল এবং যোনিপথের পিএইচ (pH) ভারসাম্য বজায় রাখে।
পিরিয়ডের ব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘরোয়া উপায়
খাবারের পাশাপাশি সঠিক জীবনযাপন আপনার পিরিয়ডের দিনগুলোকে সহজ করে তুলতে পারে:
- গরম জলের সেঁক (Heat Therapy): এটি পিরিয়ড ব্যথার সবচেয়ে প্রাচীন ও কার্যকর ঘরোয়া প্রতিকার। একটি হট ওয়াটার ব্যাগ বা গরম জলের বোতল তলপেটে বা কোমরের নিচে রাখলে শরীরের ওই অঞ্চলের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। তাপ পেশিগুলোকে শিথিল করে দেয়, ফলে জরায়ুর তীব্র সংকোচন ও ব্যথা দ্রুত কমে আসে।
- হালকা যোগব্যায়াম (Gentle Yoga): পিরিয়ডের সময় ভারী ব্যায়াম নিষেধ হলেও যোগব্যায়াম অত্যন্ত উপকারি। বিশেষ করে ‘চাইল্ড পোজ’ (Child’s Pose) পিঠের নিচের অংশের ব্যথা কমায় এবং ‘ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ’ (Cat-Cow Stretch) পেলভিক অঞ্চলের রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে। এটি শরীরের স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে আপনাকে মানসিকভাবে শান্ত রাখে।
- হাইড্রেটেড থাকা (Hydration): পিরিয়ডের সময় শরীরে জলের ঘাটতি হলে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি এবং পেট ফাঁপার (Bloating) মতো সমস্যা বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত জল পান করলে রক্ত পাতলা থাকে এবং শরীরের বর্জ্য পদার্থ বা টক্সিন সহজেই বেরিয়ে যায়। দিনে অন্তত ৩ লিটার জল পান করা এই সময়ে বাধ্যতামূলক।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নাবলী (FAQs about Best Foods to Eat and Avoid During Periods)
১. পিরিয়ডের সময় কেন ঝাল খাবার খেতে মানা করা হয়?
ঝাল বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবারে থাকা ‘ক্যাপসাইসিন’ পাকস্থলী ও অন্ত্রের আস্তরণে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। পিরিয়ডের সময় হরমোনের প্রভাবে হজম প্রক্রিয়া এমনিতেই সংবেদনশীল থাকে, তাই ঝাল খাবার খেলে গ্যাস, অ্যাসিডিটি, বুক জ্বালাপোড়া এবং অনেকের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার সমস্যা দেখা দেয়। এটি আপনার শারীরিক অস্বস্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. পিরিয়ডের সময় ঠান্ডা জল বা আইসক্রিম খেলে কি রক্ত জমাট বাঁধে?
এটি সম্পূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ধারণা বা মিথ। আমাদের পরিপাকতন্ত্র এবং প্রজননতন্ত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ঠান্ডা জল বা আইসক্রিম খেলে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, পিরিয়ডের সময় ঠান্ডা খাবার শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমিয়ে পেশির জড়তা বাড়াতে পারে। তাই আরাম পেতে ঈষদুষ্ণ বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জল পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৩. লেবুর শরবত কি পিরিয়ডের সময় উপকারী?
হ্যাঁ, লেবুর শরবত এই সময়ে অত্যন্ত কার্যকরী। লেবুতে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন-সি উদ্ভিদজাত খাবার (যেমন শাক) থেকে আয়রন শোষণে শরীরকে সাহায্য করে। এছাড়া পিরিয়ডের সময় অনেক নারীর বমি বমি ভাব বা খাবারে অরুচি হয়, লেবুর শরবত সেই অস্বস্তি কাটিয়ে রুচি ফিরিয়ে আনে এবং শরীরকে সতেজ রাখে।
৪. পিরিয়ডের সময় ডাবের জল খাওয়া কি ঠিক?
অবশ্যই ঠিক এবং এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। ডাবের জলে থাকা পটাশিয়াম, সোডিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি প্রাকৃতিক হাইড্রেটর হিসেবে কাজ করে এবং পিরিয়ড চলাকালীন পেশির খিঁচুনি বা ‘লেগ ক্র্যাম্প’ কমাতে বিশেষ সাহায্য করে। তবে যাদের কিডনির সমস্যা আছে তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এটি পান করবেন।
৫. পিরিয়ড ক্র্যাম্প কমাতে আদা চা কতটা কার্যকরী?
আদাকে প্রাকৃতিক আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) বলা হয়। আদায় থাকা ‘জিনজারল’ এবং ‘শোগাওল’ উপাদানগুলো শরীরে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন (যা ব্যথার জন্য দায়ী হরমোন) উৎপাদন কমিয়ে দেয়। দিনে ২-৩ বার চিনি ছাড়া আদা চা পান করলে পিরিয়ডের ব্যথা ওষুধের মতোই কার্যকরভাবে হ্রাস পায় এবং মানসিক ক্লান্তি দূর হয়।




Leave a Comment