Asima Chatterjee First Indian Doctorate Woman: বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় নারীর স্থান ছিল মূলত চার দেওয়ালের অন্দরে, তখন কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যা বিজ্ঞানের কঠিনতম পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ডঃ অসীমা চ্যাটার্জি। কেবল মেধা নয়, অদম্য জেদ আর পরিশ্রমের জোরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন first woman D.Sc. Calcutta University। আজ আমরা যখন আধুনিক ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের ওপর ভরসা করি, তখন আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই বিপ্লবের বীজ বপন করেছিলেন এই বাঙালি মহিয়সী।
Indian Women in STEM-এর পথপ্রদর্শক অসীমা চ্যাটার্জির যাত্রা শুরু হয় কীভাবে
১৯১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় অসীমা চ্যাটার্জির জন্ম। তাঁর পিতা ইন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং উদ্ভিদবিদ্যার প্রচণ্ড অনুরাগী। বাবার এই উদ্ভিদপ্রীতিই অসীমার মনে বিজ্ঞানের বীজ বুনে দিয়েছিল। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে রসায়নে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
তৎকালীন সময়ে রসায়ন শাস্ত্র ছিল মূলত পুরুষদের আধিপত্যের জায়গা। কিন্তু অসীমা তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে সহপাঠী ও শিক্ষকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আধুনিক যুগে Indian women in STEM বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীদের যে জয়জয়কার আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন অসীমা চ্যাটার্জি।
রসায়ন শাস্ত্রে ভারতের প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী: Asima Chatterjee First Indian Woman to Get a Doctorate in Science
১৯৪৪ সালে অসীমা চ্যাটার্জি রসায়ন শাস্ত্রে তাঁর গবেষণার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট (D.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে ডক্টরেট পাওয়া প্রথম নারী। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল ‘প্ল্যান্ট প্রোডাক্টস’ এবং ‘সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি’।
পরাধীন ভারতে ল্যাবরেটরির সরঞ্জামের অভাব ছিল প্রকট। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের একটি ছোট ঘরে তিনি তাঁর গবেষণা শুরু করেন। ল্যাবরেটরির আধুনিক সরঞ্জাম এবং দামী রাসায়নিক কেনার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা আর দাঙ্গার মধ্যেও তাঁর ল্যাবরেটরির আলো কোনোদিন নেভেনি।

আয়ুর্বেদ ও আধুনিক বিজ্ঞানের সেতুবন্ধন: Asima Chatterjee Medicinal Plants Research
অসীমা চ্যাটার্জির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো হাজার বছরের পুরনো ভারতীয় আয়ুর্বেদকে আধুনিক বিজ্ঞানের রসায়ন দিয়ে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা। তাঁর এই Asima Chatterjee medicinal plants সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদ রসায়নের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
১. মৃগী রোগের অব্যর্থ ওষুধ: Ayush-56 Inventor
ডঃ চ্যাটার্জি ছিলেন বিখ্যাত Ayush-56 inventor। তিনি ভেষজ উদ্ভিদের নির্যাস থেকে মৃগী বা এপিলেপসি রোগের অত্যন্ত কার্যকরী ওষুধ ‘আয়ুশ-৫৬’ তৈরি করেন। এটি ছিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং সাধারণ মানুষের নাগালে। আজও ভারত সরকারের আয়ুর্বেদ বিভাগ এই anti-epileptic herbal medicine ব্যবহার করে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
২. ক্যানসার বিরোধী লড়াই ও ‘নয়নতারা’
তিনি ‘নয়নতারা’ (Vinca rosea) এবং ‘সর্পগন্ধা’ (Rauwolfia serpentina) গাছের ওপর দীর্ঘ কাজ করেছিলেন। এই গাছগুলো থেকে তিনি এমন কিছু ‘অ্যালকালয়েড’ আলাদা করেন যা ক্যানসার কোষের বিভাজন রুখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যানসার চিকিৎসায় তাঁর এই গবেষণা আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছিল।
Organic Chemistry India: গবেষণার নতুন দিগন্ত
ভারতে Organic Chemistry India-র প্রসারে অসীমা চ্যাটার্জির অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৪৮ সালে তিনি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Caltech)-এ কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে তিনি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পাউলিং-এর সাথে কাজ করেন। বিদেশের মাটিতে থেকেও তিনি তাঁর ভারতীয় সত্ত্বা এবং শাড়ি পরা ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন।
বয়সের মাইলফলক: যখন ইতিহাস গড়লেন অসীমা
- মাত্র ২৭ বছর বয়স (১৯৪৪ সাল): অসীমা চ্যাটার্জি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর Doctor of Science (D.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন। সেই রক্ষণশীল সময়ে মাত্র ২৭ বছর বয়সের একজন বাঙালি কন্যার পক্ষে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ এই শিখরে পৌঁছানো ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে মেধার কোনো বয়স হয় না।
- ৪৪ বছর বয়স (১৯৬১ সাল): রসায়ন শাস্ত্রে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের জন্য তিনি প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর’ (Shanti Swarup Bhatnagar) পুরস্কার জয় করেন।
- ৫৮ বছর বয়স (১৯৭৫ সাল): বিজ্ঞান ও গবেষণায় তাঁর আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।
অসীমা চ্যাটার্জির পুরস্কার ও সম্মাননার মুকুট। Asima Chatterjee First Indian Doctorate Woman
অসীমা চ্যাটার্জি তাঁর কাজের জন্য অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন:
- শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার (১৯৬১): রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম নারী বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি এই শ্রেষ্ঠ সম্মান পান।
- পদ্মভূষণ (১৯৭৫): ভারত সরকার তাঁকে তাঁর আজীবন অবদানের জন্য পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে।
- রাজ্যসভা সদস্য (১৯৮২): তিনি বিজ্ঞানের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন।
- গুগল ডুডল (২০১৭): তাঁর ১০০তম জন্মবার্ষিকীতে গুগল বিশেষ ডুডল তৈরি করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়।
উপসংহার
ডঃ অসীমা চ্যাটার্জি কেবল একজন রসায়নবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ গাছপালা থেকেই অসাধারণ সব ওষুধ তৈরি করা সম্ভব। আজ যখন বিশ্বজুড়ে ‘হারবাল মেডিসিন’-এর জয়জয়কার, তখন অসীমা চ্যাটার্জিই ছিলেন সেই পথিকৃৎ যিনি কয়েক দশক আগেই এই পথ দেখিয়েছিলেন। বাঙালি এই কন্যার জীবন প্রতিটি ভারতীয় নারীর জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।
FAQs about Asima Chatterjee First Indian Doctorate Woman: অসীমা চ্যাটার্জি ও তাঁর রহস্যময় আবিষ্কার
১. ডঃ অসীমা চ্যাটার্জি কি সত্যিই ক্যানসার নিরাময়ের গোপন সূত্র জানতেন?
অসীমা চ্যাটার্জি ক্যানসার পুরোপুরি নিরাময়ের দাবি না করলেও, তিনি ‘নয়নতারা’ গাছের ওপর গবেষণার মাধ্যমে এমন কিছু অ্যালকালয়েড আলাদা করেছিলেন যা ক্যানসার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দমনে অত্যন্ত কার্যকর। তাঁর এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটিই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে আধুনিক কিমোথেরাপি এবং ক্যানসারের ওষুধ তৈরির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
২. কেন অসীমা চ্যাটার্জিকে ভারতের ‘ভেষজ রসায়নের সম্রাজ্ঞী’ বলা হয়?
কারণ তিনি কেবল প্রাচীন আয়ুর্বেদকে বিশ্বাস করেননি, বরং তাকে আধুনিক রসায়নের ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী যিনি ল্যাবরেটরিতে বসে ভেষজ উদ্ভিদ থেকে মৃগী রোগের কার্যকরী ওষুধ ‘আয়ুশ-৫৬’ তৈরি করেন।
৩. ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম কিনতে কি তিনি সত্যিই নিজের গয়না বিক্রি করেছিলেন?
এটি একটি বহুল প্রচলিত তথ্য। ১৯৪০-এর দশকে পরাধীন ভারতে বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য সরকারি অনুদান ছিল যৎসামান্য। ডঃ চ্যাটার্জি তাঁর গবেষণাগারের আধুনিক সরঞ্জাম এবং দামী রাসায়নিক কেনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
৪. অসীমা চ্যাটার্জির আবিষ্কৃত মৃগী রোগের ওষুধ কি আজও ব্যবহৃত হয়?
হ্যাঁ, ডঃ চ্যাটার্জির ফর্মুলায় তৈরি ‘আয়ুশ-৫৬’ (Ayush-56) আজও ভারতের কেন্দ্রীয় আয়ুর্বেদ গবেষণা পরিষদ (CCRAS) এবং বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তৈরি করে। এটি মূলত মৃগী বা এপিলেপসি রোগীদের জন্য একটি নিরাপদ anti-epileptic herbal medicine হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৫. অসীমা চ্যাটার্জি বর্তমান প্রজন্মের নারীদের জন্য কেন বড় অনুপ্রেরণা?
অসীমা চ্যাটার্জি এমন এক সময়ে সফল হয়েছিলেন যখন নারীদের বিজ্ঞান পড়া ছিল এক সামাজিক বাধা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক নিষ্ঠা থাকলে ল্যাবরেটরির অভাব বা সামাজিক বাধার মুখেও বিশ্বজয় করা সম্ভব। তিনি কেবল ডিগ্রি পাননি, বরং কয়েক হাজার বছরের পুরনো আয়ুর্বেদকে আধুনিক বিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলে সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োগ করেছিলেন।




Leave a Comment