Sarojini Naidu First Woman Governor: সরোজিনী নাইডু এমন একজন মহীয়সী নারী ছিলেন, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে কবিতা এবং বিদ্রোহ একই সাথে চলতে পারে। ১৮৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি হায়দ্রাবাদে এক বিদগ্ধ বাঙালি পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এবং মা বরদাসুন্দরী দেবী ছিলেন একজন প্রভাবশালী কবি। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশেই সরোজিনী বড় হয়েছিলেন, যেখানে বিজ্ঞান আর সাহিত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল।
বাঙালি ব্রাহ্মণ কন্যার দক্ষিণ ভারতীয় অব্রাহ্মণ ব্যক্তিকে বিয়ে – সরোজিনী নাইডুর প্রেম ও সাহসের এক অনন্য উপাখ্যান (The Bold Personal Life)
সরোজিনী নাইডুর ব্যক্তিগত জীবন ছিল তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রথা ভাঙার এক উজ্জ্বল ও সাহসী উদাহরণ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি ডঃ মুথিয়ালা গোবিন্দরাজুলু নাইডুর প্রেমে পড়েন। সেই সময়ে আন্তঃপ্রাদেশিক এবং ভিন্ন জাতের (Inter-caste) বিয়ে ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সরোজিনী ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে অটল।
তাঁর পরিবার প্রগতিশীল হওয়ায় এই বিয়েতে সম্মতি দিলেও সমাজ তা সহজে মেনে নেয়নি। ১৮৯৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ কন্যার দক্ষিণ ভারতীয় অব্রাহ্মণ ব্যক্তিকে বিয়ে করা সেই সময়ে কেবল একটি বিবাহ ছিল না, বরং তা ছিল নারীশক্তির এক বড় নীরব বিপ্লব। এটি প্রমাণ করেছিল যে তিনি কেবল মুখে প্রগতির কথা বলতেন না, তা নিজের জীবনেও কার্যকর করতেন।
কেন সরোজিনী নাইডু ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’? (The Literary Genius)
সরোজিনী নাইডু ছোটবেলা থেকেই অবিশ্বাস্য মেধাবী ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেন। তাঁর ইংরেজি কবিতার মাধুর্য এবং শব্দের ঝংকার দেখে বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর কণ্ঠ ও কবিতার মাধুর্য দেখে তাঁকে ‘ভারত কোকিলা’ বা ‘Nightingale of India’ উপাধি দিয়েছিলেন।
তাঁর লেখা ‘The Golden Threshold’ এবং ‘The Bird of Time’ আজও বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তাঁর কবি হৃদয়কে বিদ্রোহী করে তোলে। দেশের পরাধীনতা তাঁকে এতটাই ব্যথিত করেছিল যে তিনি তাঁর প্রিয় কবিতা লেখা ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন— “যখন আমার দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি, তখন বাঁশিতে সুর তোলা আমার সাজে না।”

নারীদের ভোটাধিকার ও সমানাধিকারের লড়াই (Pioneer of Feminism) লড়েছিলেন সরোজিনী নাইডু
সরোজিনী নাইডু কেবল রাজনীতির অলঙ্করণ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতীয় নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯১৭ সালে তিনি ‘উইমেনস ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ (WIA) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এনি বেসান্তের সাথে মিলে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতীয় নারীদের ভোটাধিকারের জন্য দাবি জানান।
তিনি ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, ভারতের গঠনমূলক কাজে নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশ কখনো এগোতে পারবে না। আজকের স্বাধীন ভারতে নারীরা যে সমানভাবে ভোট দিতে পারেন এবং শাসনকার্যে অংশ নেন, তার পেছনে সরোজিনী নাইডুর সেই নিরলস সংগ্রামের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২৫ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম ভারতীয় মহিলা সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
গান্ধীজির হাত ধরে লবণ সত্যাগ্রহ ও ধরসানা অভিযানের নেতৃত্ব (Leadership in Salt Satyagraha) দেন সরোজিনী নাইডু
মহাত্মা গান্ধী যখন ১৯৩০ সালে ডান্ডি অভিযান করেন, তখন সরোজিনী নাইডু ছিলেন তাঁর ছায়ার মতো একনিষ্ঠ সঙ্গী। গান্ধীজি গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব আসে সরোজিনীর কাঁধে। তিনি নিজে ‘ধরসানা লবণ সত্যাগ্রহ’ (Dharasana Satyagraha)-এর নেতৃত্ব দেন।
ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিচার্জ এবং অমানুষিক অত্যাচারের সামনে তিনি এবং তাঁর সাথে থাকা হাজার হাজার সত্যাগ্রহী এক ইঞ্চিও পিছু হঠেননি। মার্কিন সাংবাদিক ওয়েব মিলার তাঁর সেই অকুতোভয় সাহসিকতার কথা লিখে বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন। সরোজিনী নাইডু প্রমাণ করেছিলেন যে নারীরাও রণক্ষেত্রে সেনাপতির ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিতে পারেন।
ভারতের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল সরোজিনী নাইডু: রাজভবনে এক ‘মা’ (The People’s Governor)
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে তিনি উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের রাজ্যের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল। তবে রাজভবনের বিলাসবহুল আড়ম্বর বা প্রোটোকল তাঁর কখনোই পছন্দ ছিল না।
তিনি মজা করে বলতেন, “আমি নিজেকে এই প্রাসাদের খাঁচায় বন্দি একটি সোনালি পাখি মনে করি।” রাজ্যপাল হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ নিজের কানে শুনতেন এবং সরাসরি তাঁদের সাথে মিশতেন। তিনি মনে করতেন, পদমর্যাদা বিলাসিতার জন্য নয়, বরং দায়িত্ব পালনের জন্য। লখনউয়ের রাজভবন তাঁর আমলে এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটেছিল।
মনে রাখবেন, আমরা নারী আমরা পারি
সরোজিনী নাইডু সম্পর্কে ৫ অজানা ও আবেগঘন তথ্য (FAQs about Sarojini Naidu First Woman Governor)
১. সরোজিনী নাইডু কীভাবে রাজনীতিতে এলেন?
সরোজিনী মূলত কবি ছিলেন। কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। এরপর গোপাল কৃষ্ণ গোখলের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং গোখলে তাঁকে রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা দেন। গোখলে বলেছিলেন, “তোমার কলমকে এখন দেশের মুক্তির কাজে ব্যবহার করো।”
২. গান্ধীজি ও সরোজিনী নাইডুর সম্পর্ক কেমন ছিল?
গান্ধীজি সরোজিনীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং মজা করে তাঁকে ‘মিকি মাউস’ বলে ডাকতেন। অন্যদিকে সরোজিনী গান্ধীজিকে বলতেন ‘ছোট্ট লাঠিধারী জাদুকর’। তাঁদের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা এবং নির্মল বন্ধুত্বের মিশেল। জেলখানায় থাকার সময়ও সরোজিনী গান্ধীজির স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতেন।
৩. সরোজিনী নাইডু কি বাংলা জানতেন?
হ্যাঁ, তিনি জন্মসূত্রে বাঙালি ছিলেন। যদিও তাঁর বেড়ে ওঠা হায়দ্রাবাদে এবং শিক্ষা লন্ডনে, তবুও তিনি বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান অনুভব করতেন। তাঁর অনেক কবিতায় ভারতীয় গ্রামবাংলার সহজ-সরল রূপ ফুটে উঠেছে।
৪. সরোজিনী নাইডুর মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?
রাজ্যপাল হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন ১৯৪৯ সালের ২ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লখনউতে তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো ভারত এক মহান কবি এবং লড়াকু নেত্রীকে হারিয়েছিল।
৫. নারীদের জন্য সরোজিনী নাইডুর শেষ বার্তা কী ছিল?
তিনি বিশ্বাস করতেন, “নারী হলো ঘরের প্রদীপ এবং দেশের ভাগ্যবিধাতা।” তিনি নারীদের বলতেন কখনো নিজেদের দুর্বল ভাববে না, কারণ পুরুষ ও নারী মিলে একটি পাখির দুটি ডানার মতো, যার একটি দুর্বল হলে দেশ উড়তে পারবে না।




Leave a Comment