First Indian Woman Grandmaster Koneru Humpy: দাবার বোর্ডে ঘোড়া যখন আড়াই ঘর চালে, কিংবা গজ যখন কোণাকুণি ছুটে গিয়ে প্রতিপক্ষের মন্ত্রীকে বন্দি করে—সেই রণকৌশলের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার অতল থেকে উঠে আসা এক নাম হল কোনেরু হাম্পি। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের এক সাধারণ মেয়ে, যিনি দাবার বোর্ডে নিজের ভাগ্য নিজেই লিখেছিলেন। তাঁর গল্প কেবল সাফল্যের নয়, বরং সেই প্রতিভার, যা পুরুষতান্ত্রিক দাবার দুনিয়ায় নিজের অধিকার আদায় করে নিয়েছে। মনে রাখবেন, আমরা নারী আমরা পারি।
রাজা-রানির লড়াইয়ে এক সাধারণ মেয়ের বিশ্বজয়
১৯৮৭ সালে যখন হাম্পির জন্ম হয়, তার বাবা অশোক কোনেরু মেয়ের নাম রেখেছিলেন ‘হাম্পি’। এই নামের একটি বিশেষ অর্থ আছে— ‘চ্যাম্পিয়ন’ বা ‘বিজেতা’। বাবা নিজেই ছিলেন একজন দক্ষ দাবাড়ু। তিনি চেয়েছিলেন তার অপূর্ণ স্বপ্ন যেন মেয়ের দুচোখ দিয়ে পূর্ণতা পায়। হাম্পির বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন থেকেই তার আঙুলগুলো দাবার ঘুঁটি চিনতে শেখে। শৈশবের পুতুল খেলার বয়সে হাম্পি শিখেছিলেন কীভাবে কিস্তিমাত করতে হয়।
সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার
২০০২ সাল। দাবার ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হলো হাম্পির নাম। মাত্র ১৫ বছর ১ মাস ২৭ দিন বয়সে তিনি অর্জন করলেন দাবার সর্বোচ্চ খেতাব— গ্র্যান্ডমাস্টার (GM)। তিনি কেবল ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টারই নন, বরং সেই সময়ে তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ মহিলা যিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন।
হাম্পির এই জয় কেবল তার একার ছিল না; এটি ছিল ভারতের লক্ষ লক্ষ মেয়ের জয়, যারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে মেধা ও পরিশ্রম থাকলে পাহাড় সমান বাধাও টপকানো সম্ভব। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার সেই মুহূর্তে হাম্পির চোখের জল কি কেবল আনন্দের ছিল? না, তা ছিল হাজার হাজার ঘণ্টার পরিশ্রম, নিদ্রাহীন রাত আর বাবার আত্মত্যাগের প্রতিফলন।

মা ও খেলোয়াড়: এক কঠিন লড়াই
নারীর জীবনের সার্থকতা কেবল ক্যারিয়ারে নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাতেও। হাম্পির জীবনেও এমন এক সময় এসেছিল যখন তাকে দাবা থেকে বিরতি নিতে হয়েছিল। বিয়ের পর এবং মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার সময় তিনি প্রায় দু’বছর দাবার বোর্ড থেকে দূরে ছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন হাম্পি ফুরিয়ে গেছেন। কিন্তু রানি কি কখনো হার মানেন?
২০১৯ সালে তিনি যখন ওয়ার্ল্ড র্যাপিড চেস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতলেন, বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল এক মায়ের ফিরে আসা। কোলের সন্তানকে সামলানোর পাশাপাশি তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের লড়াই চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন, তা কেবল হাম্পির মতো যোদ্ধাই জানেন। তার এই কামব্যাক ছিল সেই সব নারীদের জন্য বার্তা, যারা মনে করেন সন্তান হওয়ার পর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়।
আরও জানুন: অলিম্পিক জয়ী প্রথম ভারতীয় মহিলা কে
দাবার বোর্ডে হাম্পির রাজকীয় অর্জন
হাম্পির অর্জনের তালিকা দীর্ঘ, কিন্তু প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে এক একটি লড়াইয়ের ইতিহাস:
এশিয়ান গেমস সোনা: আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের তেরঙা উঁচিয়ে ধরা।
অর্জুন পুরস্কার (২০০৩): দেশের প্রতি তার অবদানের স্বীকৃতি।
পদ্মশ্রী (২০০৭): ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান।
ফিডে ওমেন’স গ্র্যান্ড প্রিক্স: দাবার বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ।
ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার কোনেরু হাম্পি সম্পর্কিত সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs On First Indian Woman Grandmaster Koneru Humpy)
১. কোনেরু হাম্পি কি ভারতের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার?
উত্তর: না, কোনেরু হাম্পি হলেন ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার (Grandmaster)। ২০০২ সালে তিনি যখন এই খেতাব অর্জন করেন, তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী গ্র্যান্ডমাস্টার। উল্লেখ্য যে, ভারতের প্রথম পুরুষ গ্র্যান্ডমাস্টার হলেন বিশ্বনাথন আনন্দ।
২. মাতৃত্বকালীন বিরতির পর হাম্পি কোন বড় জয়টি অর্জন করেন?
উত্তর: দীর্ঘ দুই বছরের বিরতি কাটিয়ে ২০১৯ সালে রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত World Rapid Chess Championship-এ তিনি স্বর্ণপদক জিতে এক অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন (Comeback) করেন। এটি ক্রীড়া ইতিহাসে অন্যতম সেরা ‘মাদার-অ্যাথলেট’ স্টোরি হিসেবে স্বীকৃত।
৩. দাবার জগতে হাম্পির সর্বোচ্চ রেটিং কত?
উত্তর: কোনেরু হাম্পির সর্বোচ্চ ইলো রেটিং (Elo Rating) ছিল ২৬০৬। কিংবদন্তি জুডিথ পোলগারের পর তিনি ছিলেন বিশ্বের দ্বিতীয় নারী দাবাড়ু, যিনি ২৬০০ রেটিং পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন।
৪. দাবার প্রসারে হাম্পির অবদান কী?
উত্তর: হাম্পির সাফল্য ভারতে মহিলা দাবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। তার দেখানো পথেই আজ বৈশালী রমেশবাবু বা হরিকা দ্রোণাভাল্লির মতো তারকারা বিশ্বমঞ্চে ভারতের নাম উজ্জ্বল করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রম করলে দক্ষিণ এশিয়ার নারীরাও দাবার মতো বুদ্ধিদীপ্ত খেলায় বিশ্ব শাসন করতে পারে।
৫. তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে কী কী সম্মাননা পেয়েছেন?
উত্তর: ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৩ সালে অর্জুন পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত হন।




Leave a Comment