Sudden Mood Swings Hormone: মানুষের আবেগ এবং মেজাজ অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। এই ঢেউ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের এন্ডোক্রাইন সিস্টেম থেকে নিঃসৃত হওয়া কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যাদের আমরা হরমোন বলি। যখন এই হরমোনগুলোর ভারসাম্যে সামান্য হেরফের হয়, তখনই শুরু হয় অকারণে মন খারাপ বা মুড সুইং।
মুড সুইংয়ের জন্য দায়ী প্রধান হরমোনসমূহ
হঠাৎ মন খারাপের পেছনে মূলত চারটি প্রধান হরমোন বা নিউরোট্রান্সমিটার কাজ করে:
১. সেরোটোনিন (Serotonin): ‘হ্যাপি হরমোন’
সেরোটোনিনকে বলা হয় শরীরের প্রাকৃতিক ‘ফিল-গুড’ হরমোন। এটি আমাদের ঘুম, ক্ষুধা এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে গেলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং হঠাৎ কান্নার প্রবণতা দেখা দেয়।
২. ডোপামিন (Dopamine): ‘পুরস্কারের হরমোন’
যখন আমরা কোনো কাজে সফল হই বা আনন্দ পাই, তখন মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে। ডোপামিনের অভাব হলে কোনো কাজে উৎসাহ পাওয়া যায় না, জীবন একঘেয়ে লাগে এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ হয়।
৩. কর্টিসল (Cortisol): ‘স্ট্রেস হরমোন’
যখন আমরা অতিরিক্ত চাপে থাকি, তখন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল নিঃসৃত হয়। কর্টিসলের মাত্রা দীর্ঘক্ষণ শরীরে বেশি থাকলে তা মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটায়, যার ফলে মানুষ অল্পতেই রেগে যায় বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
৪. ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন (Estrogen & Progesterone)
নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড বা গর্ভাবস্থায় এই দুটি হরমোনের ব্যাপক ওঠানামা হয়। বিশেষ করে পিরিয়ডের আগে (PMS) ইস্ট্রোজেন কমে গেলে সেরোটোনিনের মাত্রাও কমে যায়, যা ‘সাডেন মুড সুইং’-এর প্রধান কারণ।
কেন হয় এই হরমোনের ভারসাম্যহীনতা?
হরমোনের এই গোলমালের পেছনে কেবল শারীরিক কারণ নয়, লাইফস্টাইলও দায়ী:
- অপর্যাপ্ত ঘুম: ঘুমের অভাব সরাসরি ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়।
- অস্বাস্থ্যকর খাবার: অতিরিক্ত চিনি বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ফলে রক্তে ইনসুলিনের হেরফের হয়, যা মেজাজকে খিটখিটে করে তোলে।
- সূর্যালোকের অভাব: সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরি করে, যা সেরোটোনিন বাড়াতে সাহায্য করে। সূর্যালোক না পেলে শীতকালে বা বর্ষায় মন খারাপের প্রবণতা বাড়ে (Seasonal Affective Disorder)।

হরমোন নিয়ন্ত্রণ ও মন ভালো রাখার কার্যকরী উপায়
হঠাৎ মন খারাপের হাত থেকে বাঁচতে এবং হরমোনের ভারসাম্য ফেরাতে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
১. প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার ও ডার্ক চকলেট
ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন নিঃসরণ করে যা তাৎক্ষণিকভাবে মন ভালো করে দেয়। এছাড়া কলা, বাদাম এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ মাছ ডায়েটে রাখুন।
২. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
ব্যায়াম করলে শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিক পেইনকিলার এবং মুড বুস্টার হিসেবে কাজ করে। মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটাও আপনার মেজাজ বদলে দিতে পারে।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে মেরামত করে এবং হরমোনগুলোর পুনরুৎপাদন করে।
হরমোনের ভারসাম্য ফেরাতে ‘লাইফস্টাইল হ্যাকস’
হঠাৎ মন খারাপের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে নিচের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:
১. সূর্যের আলোর জাদু (Sunlight Therapy)
প্রতিদিন সকালে অন্তত ১০-১৫ মিনিট সূর্যের আলোতে কাটান। এটি আপনার মস্তিষ্কে পিনিয়াল গ্রন্থিকে সক্রিয় করে এবং সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে।
২. সোশ্যাল মিডিয়া ডিটক্স (Digital Detox)
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মস্তিষ্কে ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অন্যের জীবনের ঝলমলে ছবি দেখে নিজের অজান্তেই মস্তিষ্ক কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) নিঃসরণ করে, যা থেকে হঠাৎ মন খারাপ শুরু হয়।
৩. ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার
ম্যাগনেসিয়াম হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করতে জাদুর মতো কাজ করে। পালং শাক, কুমড়োর বীজ এবং ডার্ক চকলেট ম্যাগনেসিয়ামের চমৎকার উৎস।
মেয়েদের মুড সুইং সংক্রান্ত সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ On Sudden Mood Swings Hormone)
১. হঠাৎ খুব বেশি কান্না পাওয়া কি কোনো রোগের লক্ষণ?
উত্তর: না, সব সময় এটি রোগ নয়। শরীরে সেরোটোনিন হরমোন হঠাৎ কমে গেলে বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ইমোশনাল আউটবার্স্ট হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. ছেলেদের কি হরমোনের কারণে মুড সুইং হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘টেস্টোস্টেরন’ হরমোনের মাত্রা কমে গেলে তারা হতাশ বা খিটখিটে অনুভব করতে পারে। একে অনেক সময় ‘মেল মেনোপজ’ বলা হয়।
৩. কফি খেলে কি মন ভালো হয়?
উত্তর: ক্যাফেইন সাময়িকভাবে ডোপামিন বাড়িয়ে সতর্কতা বাড়ায়, কিন্তু অতিরিক্ত কফি খেলে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) বেড়ে যায়, যা পরে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিতে পারে।
৪. ভিটামিন-ডি এর সাথে মন খারাপের কী সম্পর্ক?
উত্তর: ভিটামিন-ডি সরাসরি সেরোটোনিন হরমোনের কার্যকারিতার সাথে যুক্ত। তাই ভিটামিন-ডি এর অভাবে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা হতে পারে।
৫. মুড সুইং বন্ধ করার দ্রুত উপায় কী?
উত্তর: গভীর শ্বাস নেওয়া (Deep Breathing), ঠান্ডা জল পান করা এবং পছন্দের কোনো গান শোনা বা প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলা মুড দ্রুত পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।




Leave a Comment